শিবলী নোমান

করোনাকালের দুইখানা খোলা চিঠি

খোলা চিঠি, অনলাইন ক্লাস প্রসঙ্গে…
(যাদের সাথে আমার শ্রেণিকক্ষে দেখা হয় আর আমি প্রতিদিন সমৃদ্ধ হই, তাদের প্রতি)

আমার প্রিয়জনেরা,
নিঃসন্দেহেই আমরা খুব কঠিন একটা সময় পার করছি। চলমান মহামারীর সাথে আমাদের উপর চেপে বসেছে আম্পানের ঝড়ো হাওয়া, আমরা রয়েছি বন্যা পরিস্থিতিতেও। এর সাথে ভয় আছে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ার। একের পর এক খারাপ খবরে মানসিকভাবেও আমরা অনেকেই বিপর্যস্ত।

এই কঠিন পরিস্থিতিতে অনলাইনে ক্লাস কার্যক্রম শুরু হওয়া নিশ্চিতভাবেই আমাদের অনেককেই নতুন করে কঠিনতর অবস্থায় ফেলবে। আমরা জানি অনলাইন ক্লাস করতে প্রয়োজনীয় ল্যাপটপ কিংবা ভালো একটি স্মার্টফোন আমাদের সবার কাছে নেই। আমরা জানি আমাদের কাছে ল্যাপটপ, স্মার্টফোন থাকলেও আমরা যেখানে অবস্থান করছি সেখানে অনেকেরই ফোনের নেটওয়ার্ক নেই, ইন্টারনেটের গতি খুবই কম, বিদ্যুতের সমস্যাও রয়েছে। আমরা জানি আমাদের অনেকের ইন্টারনেট কিনে নিয়মিত ক্লাস করার স্বচ্ছলতা নেই। আমরা জানি পরিবারকে সহায়তার জন্য এখন অনেকেই আমরা বাবার সাথে মাঠে কাজ করছি কিংবা অন্য কোনভাবে পরিবারকে সাহায্য করছি। আমরা অনেকেই টিউশনি করে নিজে চলতাম, পরিবারকে সহায়তা করতাম, তাই এই চরম অবস্থায় ইন্টারনেট কেনার জন্য পরিবারের উপর আলাদা চাপ দেয়ার অবস্থাও আমাদের নেই।

এই সব বাস্তবতাকে সাথে নিয়েই আমাদের অনলাইন ক্লাস শুরু করতে হচ্ছে। কারণ তা নাহলে আমাদের সামনে দীর্ঘ সেশন জটের বিপদও দেখা যাচ্ছে, যার প্রভাব মহামারী পরবর্তী জীবনে নতুন আঘাত হিসেবে আমাদেরই সামনে আসবে।

এই শাখের করাতের মতো অবস্থায় আমি শুধু এটুকুই বলতে চাই, তোমাদের সাথে শ্রেণিকক্ষে আমি আমার শ্রেষ্ঠ সময়টা কাটিয়ে এসেছি, আমি তোমাদের সবাইকে শ্রেণিকক্ষেই দেখতে চাই, যত দ্রুত সম্ভব। কারণ আমাদের বর্তমান প্রেক্ষাপটে অনলাইন ক্লাস বেশ বৈষম্যমূলক বাস্তবতা, আমি বিশ্বাস করি এই বাস্তবতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণার সাথে যায় না।

মাঝে এই সময়টুকুতে যে ক্লাসগুলো অনলাইনে হবে, তার ফলে সজ্ঞানে আমি তোমাদের একজনকেও ক্ষতিগ্রস্ত হতে দিবো না, অন্তত ক্ষতিগ্রস্ত না করার চেষ্টাটুকু করবো। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে যেটুকু সময়ই পাই না কেন, আমরা একসাথে নিজেদের জন্য কাজ করবো, রাত-দিন আমরা নিজেদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে চেষ্টা করবো।

এই সময়ে বা অন্য কোন সময়ে তোমাদের কারো যদি মনে হয় আমার কারণে বা আমার কোন আচরণে তোমাদের কারো ক্ষতি হয়েছে, হচ্ছে বা হতে পারে, আমার অনুরোধ আমার কাছে তা স্পষ্ট করে বলবে। এর ফলে আমাদের ভেতর আলোচনার পাশাপাশি পারস্পরিক সম্পর্কেরও উন্নতি হবে বলে আশা করতে দোষ নেই। মানুষের সাথে কথা বলে সমাধান হয় না, এমন কোন সমস্যার অস্তিত্ব নেই, কখনো ছিল না।

তোমরা ভালো থেকো, তোমাদের ভালো থাকা আমাকে ভালো রাখে।

ইতি,
শিবলী নোমান
জাহাঙ্গীরনগর
জুলাই ০৯, ২০২০

 

 

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে এক বছর পর আরেকটি খোলা চিঠি…

আমার প্রিয়জনেরা,
এই নিদারুণ দুঃসময়ে তোমরা সবাই ভালো আছো, এমন আশা প্রকাশের মাধ্যমে শুরু করতেও কুণ্ঠাবোধ করছি। জানি না তোমাদের ভেতর কতজন এই মুহূর্তে মহামারীর ধাক্কায় নতুন করে বিপর্যস্ত হয়েছো, হচ্ছো। এই মহামারী আমাদের সবাইকে কোন না কোনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, তাই শুধু এটুকু বলি, আমরা একই পথের পথিক।

ঠিক এক বছর আগে, অনলাইনে ক্লাস শুরুর প্রাক্কালে তোমাদের উদ্দেশ্যে লিখেছিলাম। আমি ভেবেছিলাম স্বল্প সময়ের ভেতরই আবারও আমরা শ্রেণিকক্ষে ফিরতে পারবো, কতটা অদূরদর্শী চিন্তা করেছিলাম তা উপলব্ধি করছি আজ, এক বছর পেরিয়ে এসে।

গত এক বছর আমরা অনলাইনে ক্লাস করলাম, অনেকে চূড়ান্ত পরীক্ষাও দিয়েছো বা দিচ্ছো। জানি না আরো কতদিন অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালাতে হবে।

এটি স্পষ্ট যে, অনলাইন ক্লাস শুরুর আগে যেসব সমস্যা ও সংকট নিয়ে আমরা ভাবছিলাম তার খুব সামান্যই সমাধান করা গিয়েছে বা সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছে৷ এত শত প্রতিকূলতার পরও তোমরা অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নেয়া চালিয়ে যাচ্ছো, তোমাদের অভিবাদন!

অনলাইনে ক্লাস শুরুর এক বছর পেরিয়ে এসে আজ মূলত দুইটি কথা বলতে চাই।

প্রথমত, বিদ্যমান ব্যবস্থায় অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম কোনভাবেই ত্রুটিমুক্ত ও বৈষম্যহীন নয়, এটি মেনে নিয়েই নিজেদের পক্ষে সর্বোচ্চটুকু দেয়ার চেষ্টা করো, যেন ১০ বছর পর নিজের কাছে স্পষ্ট থাকতে পারো যে তুমি বা তোমরা নিজেদের সর্বোচ্চটা দিয়ে অন্তত চেষ্টাটুকু করেছিলে। এই কথাটি সমানভাবে প্রযোজ্য আমার জন্যও।

দ্বিতীয়ত, এক বছর পর আমি তোমাদের জন্য আবার এভাবে লিখতে চাই না। আগামী বছর এমন সময় আমি তোমাদের সবাইকে আমার সামনে-বিভাগে-ক্যাম্পাসে দেখতে চাই। তাই তোমাদের প্রতি অনুরোধ, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলো আর খুব সাবধানে থাকো।

তোমরা খুব ভালো থাকো। আমি তোমাদের অপেক্ষায় আছি।

ইতি,
শিবলী নোমান
জাহাঙ্গীরনগর
জুলাই ০৯, ২০২১

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।