শিবলী নোমান

লজ্জার উত্তরাধিকার!

শিবলী নোমান

২০০৪ সালে আমি ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে পড়তাম। মনে আছে তখন আমাকে সিদ্ধেশ্বরী থেকে আমাদের বাসায় এসে এক ভাইয়া পড়িয়ে যেতেন। তার পুরো নাম কখনো জানার প্রয়োজন হয়নি। সোমেন ভাইয়া নামেই চিনতাম। ঐ বছর ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা ঘটনার পরপর তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ কয়েক দফা হরতাল ডেকেছিল। সেরকম এক হরতালের আগের দিন আমাকে পড়ানো শেষ করে সোমেন ভাইয়া বলেছিলেন হরতালের দিন তিনি আসবেন না। তার সাথে আমার সম্পর্ক ততদিনে অনেক বেশি খোলামেলা, মজা করেই জিজ্ঞেস করেছিলাম কেন আসবেন না। তিনি বলেছিলেন, “হরতালে পুলিশ ধরেই জানতে চাইবে নাম কী, নাম শুনেই বলবে আরে এইটা তো হিদু, এইটারে আগে মার।” সেদিন আমি মনে করেছিলাম নিতান্ত মজা করে সোমেন ভাইয়া কথাটি বলেছিলেন। কিন্তু কতটা গভীর ছিল তার এই কথার ভাবার্থ তা আজ বুঝতে পারি।

‘সংখ্যালঘু’ শব্দের অর্থ কী? জানি না আমি, সংখ্যালঘু শব্দটি শোনার আগেই আমার বন্ধুত্ব হয়েছিল শৈচী সেন, পিযুষ বিশ্বাস, পংকজ বিশ্বাস, দেবজ্যোতি কুন্ডু, অরূপ সাহা, তন্ময় দেবের সাথে। সংখ্যালঘু শব্দের অর্থ জানার আগেই আমি বাংলা, ইংরেজী, গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, কৃষিশিক্ষা সম্পর্কে পড়েছি মিলন কুমার বিশ্বাস, মৃণাল কান্তি বিশ্বাস, মুরারি মোহন বিশ্বাস, দ্বিগেন্দ্রনাথ প্রামাণিক, সুধাংশু চন্দ্র রায়, গোপাল কৃষ্ণ বিশ্বাস, বিজয় কৃষ্ণ বিশ্বাস, রবীন্দ্রনাথ সান্যাল স্যারের কাছে। সংখ্যালঘু নির্যাতন কথাটির অর্থ জানার আগে আর এই নির্যাতন প্রত্যক্ষ করার আগে থেকেই আমার চলাফেরা ছিল জ্যোতির্ময় গোলদার, হিরন্ময় গোলদার, শক্তিময় গোলদার, তুষার মুখার্জীর সাথে। এই নির্যাতন দেখার আগে থেকেই আমার সাথে ভালো সম্পর্ক তমা রায় কিংবা তুলি রায়ের সাথে। এখনো নিয়মিত বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেন উজ্জ্বল কুমার মন্ডল স্যার। দুই বছর ধরে প্রতিদিন একই কক্ষে ক্লাস করছি দেবতোষ ঘোষ, সৌগত বসু, প্রিয়াংকা দত্ত, রাজেশ চন্দ্র ধরের সাথে।

গত কয়েকদিন ধরে আমাদের আলোচনায় রয়েছে নাসিরনগরসহ আশেপাশের গ্রামে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পূজামন্ডপে প্রতিমা ভাংচুর, হামলা ও সর্বশেষ ঘর-বাড়ি পুড়িয়ে দেয়ার ঘটনা।  সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উপর এসব হামলা-নির্যাতনের নাম আমরা দিয়েছি ‘সংখ্যালঘু নির্যাতন’।  তাহলে কি যারা জন্মসূত্রে হিন্দু বা হিন্দুধর্মে বিশ্বাস করে তারাই এদেশে সংখ্যালঘু? সাথে বৌদ্ধ-খৃস্টানরা? এরপর? এরপর কি এই নির্যাতন শুরু হবে শিয়া মতাবলম্বীদের উপর? সময়ের আবর্তনে শিয়া মতাবলম্বীরাও হয়ে যাবে সংখ্যালঘু?

আমি যতটুকু বুঝি সংখ্যালঘু শব্দটিই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে যায় না। চেতনার দিক থেকে অসাম্প্রদায়িক এই যুদ্ধের ফলে প্রাপ্ত দেশে \’সাম্প্রদায়িক সংখ্যালঘু\’ শব্দটিকে অভিধানে স্থান দেয়া উচিত কিনা তাও বুঝি না। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ যেমন \’ইসলাম\’ ধর্মে বিশ্বাস করে তেমনি অধিকাংশ মানুষ ১৯৭১ এর চেতনাকে লালন করে, এটিই হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, সেটি হয়েছে বলার মত কোন ভিত্তি এই মূহুর্তে দেখা যাচ্ছে না। ২০০১ এর নির্বাচনোত্তর নির্যাতন, ২০১৪ সালে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি, কিছুদিন আগে মসজিদে মাইক ব্যবহার করে মন্দিরে হামলা, সর্বশেষ নাসিরনগর; এসবের সাথে প্রতিদিন দেশের আনাচে–কানাচে আরো এমন ঘটনা যে ঘটছে না তার নিশ্চয়তা কী! তাহলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে আলোচনা বাদ রাখাই যুক্তিযুক্ত নয় কি? এই প্রসঙ্গে ‘বাংলাদেশ বৌদ্ধ-খ্রিস্টান-হিন্দু ঐক্য পরিষদ’ কে উদ্দেশ্য করে একবার বলেছিলাম এই দেশে স্বাধীনতা বিরোধী চক্রই একমাত্র সংখ্যালঘু, এই শব্দ তাদের উদ্দেশ্যেই ব্যবহার করা উচিত। বাকি সবাই তো বাংলাদেশী বাঙালি বা বাংলাদেশী আদিবাসী। আজকে যদি আমরা সচেতনভাবে বলে থাকি সংখ্যালঘু নির্যাতন বন্ধ করতে হবে, তাহলে বক্তা যে ধর্মেরই হোক, তিনি এটুকু স্বীকার করেই নিলেন যে ইসলাম ধর্মাবলম্বী ছাড়া বাকিরা সংখ্যালঘু, আর সংখ্যালঘু মনে হয় তাদেরই বলা হয় যাদের বিপরীতে ঐ দেশের বা অঞ্চলের একটি বৃহৎ অংশ থাকে। আমরা নিশ্চয়ই কেউ নিজ ধর্ম ব্যতীত অন্য ধর্মাবলম্বীদের বিপরীতে নই।

আমার খুব লজ্জা লাগে যখন রাজনীতির নামে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের নির্যাতন করা হয়, আক্রোশ মেটাতে ধর্মকে ব্যবহার করা হয়। তাহলে তমা আর তুলি আমার কপালে ভাই ফোঁটা কি এই জন্যে দেয় যেন সংখ্যালঘু বলে তার উপর আমি কখনো নির্যাতন না করি? ওরা কি নিজেদের বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় মনে করে? বা আমার অন্যান্য বন্ধুরা? বা আমার শিক্ষকগণ? আমি বিশ্বাস করতে চাই তারা নিজেদেরকে শুধুই বাংলাদেশের নাগরিক মনে করেন, সাধারন নাগরিক, ঠিক আমার মত। আমি লজ্জায় মাটিতে মিশে গিয়েছিলাম যেদিন আমার সনাতন ধর্মাবলম্বী একজন শিক্ষক বলেছিলেন তিনি আগের মত ভোরে হাটতে বের হন না কারণ সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উপর সকালে হামলার ঘটনা ঘটে। আমার খুব লজ্জা লাগে যখন দেখি একসাথে যাদের সাথে চলাফেরা করি, উঠাবসা করি, একপাতে যাদের সাথে খাই, সময়ে সময়ে তারা \’সংখ্যালঘু\’ নামক শব্দ দ্বারা ব্র্যাকেটবন্দী হয়, কখনো আমদের দ্বারা, কখনো নিজেদের দ্বারাই। কখনো বুঝে, কখনো না বুঝে! অনেক লজ্জা লাগে! আমরা এই বাংলাদেশ কখনো চাই নি, ১৯৭১ এ না, কিংবা কখনোই না!

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।