শিবলী নোমান

ডিজিটাল মনস্তত্ত্বে ওসি হারুনের দোহাই

শিবলী নোমান

ওভার দ্য টপ বা ওটিটি প্ল্যাটফর্মের সংস্পর্শে আসা দেশের শহুরে সংস্কৃতির সদস্যদের ভেতর এই মুহূর্তে সর্বাপেক্ষা আলোচিত শব্দ সম্ভবত মহানগর। আশফাক নিপুন বা ওসি হারুনের এই মহানগর ওয়েব সিরিজের নানামুখী প্রশংসা ও সমালোচনায় এখন মুখর আমাদের ভার্চুয়াল জগত। ব্যক্তিগত মূল্যায়ন করতে হলে বলতে হয়, এই ওয়েব সিরিজের সংলাপগুলোই খুব সাধারণ এই কাহিনীকে দীর্ঘদিন মনে রাখার উপলক্ষ্য তৈরি করে দিয়েছে।

তবে এক পাশ দিয়ে এটিও বলে রাখা যেতে পারে যে, এর কাহিনীতে যেসব বিষয় উঠে এসেছে, তার সাথে গত এক সপ্তাহে এই ওয়েব সিরিজ নিয়ে যে ধরনের রাজনৈতিক আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়েছে, তাতে সবকিছু মিলে বিষয়টি খুব বেশিদিন নিতান্ত একটি ওয়েব সিরিজ বা কল্পকাহিনীর জায়গায় থাকবে বলে আমার মনে হয় না। আমার এই মনে হওয়া ভুল হলে খুবই ভালো!

যাই হোক, যেহেতু মহানগর ওয়েব সিরিজের, আরো নির্দিষ্ট করে বললে ওসি হারুনের সংলাপগুলো আমার সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়েছে, তাই নিজের শিক্ষকতা জীবনের কিছু অভিজ্ঞতাকে ওসি হারুনের সংলাপের আলোকে তুলে ধরার লোভ সামলাতে না পেরেই এই লেখার অবতাড়ণা।

গত দেড় দশকে আমাদের জীবনে ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মের সামগ্রিক প্রভাবের ফল হলো একইসাথে বাস্তব ও ভার্চুয়াল জগতে আমাদের অস্তিত্ব ও বিচরণ। আর যোগাযোগ বিষয়ক বিদ্যায়তনেও তাই ভার্চুয়াল জগতের অতিসাধারণ বিষয় থেকে রাজনৈতিক অর্থনীতি পর্যন্ত আলোচনা চলে। বর্তমানে আমি যোগাযোগ সম্পর্কিত একটি কোর্স নেয়ার কারণে এ বিষয়ক বইগুলোতে ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাবে মানবীয় যোগাযোগের পদ্ধতি ও পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা দেখতে পাই নিয়মিত। অর্থাৎ, ডিজিটাল মাধ্যমসমূহের কারণে মানবিক যোগাযোগ প্রক্রিয়ায় এক ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, যা আবার প্রায়শই ভার্চুয়াল জগত পেরিয়ে আমাদের বাস্তব জগতকেও প্রভাবিত করছে প্রতিনিয়ত। তো এই পরিবর্তনের যে দিকটা নিয়ে আজ নিজের কিছু অভিজ্ঞতা লিখতে চাই, তার নির্যাস খুঁজে পাওয়া যায় ওসি হারুনের এই সংলাপে,

পাবলিকের ধর্মই হইতেছে সব ব্যাপারে অভিযোগ করা। আপনি নিরানব্বইটা কাজ ঠিকঠাক করলেন, একটা পারলেন না, আপনি খারাপ।

ঘটনা এক

২০২২ সালের জানুয়ারি মাসে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর আমার বিভাগের একজন শিক্ষার্থী এক সড়ক দুর্ঘটনায় মারাত্মক আহত হন। ঘটনাচক্রে দুইজন শিক্ষার্থীসমেত আহত শিক্ষার্থীকে সাভারস্থ একটি হাসপাতালে নেয়ার সময় থেকে আমি সেখানে ছিলাম। আমার শিক্ষার্থীর অবস্থা ছিল খুবই আশঙ্কাজনক এবং ঐ সময় তার পরিবারের কেউ সেখানে না থাকায় পরিস্থিতিটি ছিল বেশ স্পর্শকাতর।

প্রথমে হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, তারপর সিটি স্ক্যান ও সম্ভাব্য অস্ত্রোপচারের মতো বিষয়গুলো নিয়ে তখন ভাবতে হচ্ছিলো। সময়ের সাথে সাথে হাসপাতালে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছিলো, ফলে তাদের সাথেও নিয়মিত যোগাযোগে থাকতে হচ্ছিলো যেন অপ্রীতিকর কিছু না ঘটে। তার উপর হাসপাতালের ভেতর ফোনের নেটওয়ার্কও খুব ভালো কাজ করছিল না, এখনো করে না।

এর ভেতর একটি অচেনা নাম্বার থেকে ফোন আসে আমার কাছে, আমি প্রথমে কথা বুঝতে পারছিলাম না নেটওয়ার্ক জটিলতায়। পরে নিজেই যখন ওই নাম্বারে ফোন দিলাম, তখন ওপাশ থেকে অন্য বিভাগের একজন শিক্ষার্থী আমাকে বেশ রাগত গলায় বললেন, “আপনাদের একজন শিক্ষার্থী গুরুতর আহত, গ্রুপে তার ব্যাপারে পোস্ট করা হয়েছে, আপনাকে অনেকেই মেনশন করেছে, আপনি রিপ্লাই দিচ্ছেন না কেন।”

তখন ফেইসবুকে ঐ গ্রুপে ঢুকে আমাকে মেনশন করা বেশ কিছু কমেন্টের ভেতর শুধু একটি তে আমি রিপ্লাই দিয়েছিলাম এটি জানিয়ে যে, আমি শিক্ষার্থীটির সাথে হাসপাতালে আছি। এরপর আর কোন ফোন আসেনি, বা কেউ মেনশনও করে নি জানা মতে, কারণ সন্ধ্যার পর পোস্টটিই আর খুঁজে পাই নি।

 

ঘটনা দুই

বিশেষ কারণে এই ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত শিক্ষার্থীর পরিচয় আমি প্রকাশ করতে চাই না, তাই এই ঘটনার কোন্‌ সালের তা উল্লেখ করছি না।

আমার বিভাগের একজন শিক্ষার্থী তার পুরো পরিবারসহ নিজ এলাকার স্থানীয়দের সাথে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ে, এবং সহিংসতার শিকার হয়। ঘটনাটি জানাজানি হলে ক্যাম্পাসে ঐ শিক্ষার্থীর বন্ধুরা সাহায্য চেয়ে সশরীরে ও সামাজিক মাধ্যমে যোগাযোগ শুরু করে। বিভাগের অন্যান্য ব্যাচের সাবেক-বর্তমান শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরাও নিজেদের জায়গা থেকে সচেষ্ট হন।

শিক্ষকতায় আসার আগে একাধিক টেলিভিশন চ্যানেলে কাজ করায় আমিও প্রকৃত ঘটনা ও পরিস্থিতি বোঝার জন্য একটি চ্যানেলে যোগাযোগ করিয়ে স্থানীয় প্রতিনিধিকে ঘটনাস্থলে পাঠানো যায় কিনা সে চেষ্টা করি।

সে সময় আমি জানতে পারি, ঘটনাস্থল থেকে ঐ চ্যানেলের স্থানীয় প্রতিনিধি বেশ দূরে থাকায় সেখানে পৌঁছাতে কিছুটা সময় লাগবে। ফলে আমি অপেক্ষা করছিলাম। সে সময় বিভিন্ন ব্যাচের শিক্ষার্থীদের ফোনও আসছিল, এবং তাদের মূল বক্তব্য এমন যে ফেইসবুকে এটি নিয়ে লেখালেখি হচ্ছে এবং শিক্ষকদের কোন সাড়া নেই।

এমন কিছু ফোনালাপের পর আমি ফেইসবুক গ্রুপে করা একটি পোস্টে শুধু লিখেছিলাম অমুক চ্যানেলের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হচ্ছে। বেশ কিছু লাভ রিঅ্যাক্ট পেয়েছিলাম সেই কমেন্টে। কিন্তু এরপর আর কোন ফোন আসে নি।

ঘটনার গভীরে আর না যাই। শুধু এটুকু বলে রাখি, সেই চ্যানেলের স্থানীয় প্রতিনিধি ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন এবং পুরো পরিস্থিতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দিয়ে আমাদের সহায়তা করেছিলেন, এক্ষেত্রে তিনি শুধু নিয়েছিলেন সেখানে পৌঁছানোর সময়টুকুই।

 

ঘটনা তিন, এবং এটিই শেষ

২০২২ সালের চ্যান্সেলর কাপ ফুটবল টুর্নামেন্টে বিকেলে ছেলেদের দুইটি হলের খেলা। ঘটনাচক্রে আমি এর একটি হলের আবাসিক শিক্ষকের দায়িত্বে ছিলাম। খেলা উপলক্ষ্যে দুই হলের প্রাধ্যক্ষসমেত হলগুলোর সকল শিক্ষক মাঠেই ছিলাম। খেলার শেষ দিকে একটি গোল নিয়ে রেফারির সিদ্ধান্তের পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান নেয় দুই হল। ঘটনা বাড়তে বাড়তে মাঠেই দুই হলের শিক্ষার্থীদের ভেতর কয়েক দফা হাতাহাতির ঘটনা ঘটে।

এক পর্যায়ে দুই হলের শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ হলে ফিরে যেতে রাজি করানো গেলেও, মাঠের ঘটনার জের ধরে দুই হলের শিক্ষার্থীদের ভেতর উত্তেজনা তৈরি হয়, ফলে দুই হলের ভেতর সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

প্রাথমিকভাবে হলের শিক্ষার্থীদের শান্ত করতে পারলেও এক পর্যায়ে দুই হলের শিক্ষার্থীদের ভেতর সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা এলাকায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার পর সব শেষ করে বাসায় ফিরতে ফিরতে সেদিন রাত ১০টা।

যেটা বলতে চাচ্ছি তা আসলে এই সংঘর্ষ নিয়ে না। বিষয় হলো প্রাথমিক উত্তেজনার সময় রীতি অনুযায়ী বটতলা এলাকার দোকানগুলো বন্ধ করে দিয়েছিলেন দোকানিরা। মূল সংঘর্ষের আগের শান্ত সময়ে মিনিট বিশেকের জন্য দোকানগুলো খুলতে পেরেছিলেন তারা, এর ভেতর পুনরায় এবং আরো বৃহৎ আকারে সংঘর্ষ বেধে গেলে তারা আবারও দোকানগুলো বন্ধ করে দেন। নিরাপত্তার স্বার্থে হোক বা অন্য কোন কারণে, সেই সময় দোকানে থাকা বেশ কিছু শিক্ষার্থীও দোকানে আটকা পড়ে যান।

রাতে বাসায় ফিরে ফেইসবুকে ঢুকে দেখি এরকম আটকে পড়া একজন শিক্ষার্থী গ্রুপে অভিযোগ করেছেন যে তারা দীর্ঘ সময় ধরে আটকে আছেন, সংঘর্ষ থামাতে প্রশাসনের কেউ আসে নি।

প্রশাসনের প্রশংসা করা আমার উদ্দেশ্য না, নানান কারণেই। কিন্তু নির্দিষ্ট ঐ ঘটনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টয়রিয়াল বডি ও হলের শিক্ষকগণ সেখানেই দাঁড়ানো ছিলেন। সংঘর্ষ চলাকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্যও ঘটনাস্থলে এসেছিলেন, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও ভাংচুর চলমান থাকায় এবং কোন আলো না থাকায় তিনি নির্মিতব্য লাইব্রেরি ভবনের গেটের সামনে আলোতে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন নির্দেশনা দিচ্ছিলেন এবং যোগাযোগ করছিলেন। পরবর্তী সময়ে সংঘর্ষ থেমে গেলে তিনি পুনরায় এসে দুই হলের শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে বিদ্যমান উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করেছেন।

কিন্তু প্রশাসনের কেউ নেই জাতীয় পোস্টের নিচে বছর ত্রিশেক আগে ছাত্রত্ব হারানো ব্যক্তি থেকে শুরু করে গতকাল ক্যাম্পাসে আসা শিক্ষার্থীদের নানা নেতিবাচক মন্তব্য চলমান ছিল খুব স্বাভাবিকভাবেই।

উপরোক্ত তিনটি ঘটনায় শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ বা সচেতনতা, কিংবা রাগ-ক্ষোভ-উষ্মা প্রকাশ নিয়ে আমার কোন আপত্তি নেই। আপত্তি না থাকার প্রথম কারণ তাদের বয়স ও অভিজ্ঞতাজনিত সঙ্কট, যা আমাদের সবার ক্ষেত্রেই ঘটে। অন্যদিকে, আমাদের দেশে শিক্ষকদের নিয়েও অভিযোগের অন্ত নেই। এর ভেতর অনেকগুলো যেমন দিনের আলোর মতো সত্য, তেমনি বহু অভিযোগ করা হয় না জেনে, না বুঝে, না পেয়ে এবং শিক্ষকদের ‘সফট টার্গেট’ হিসেবে পাওয়া যায় বলে।

কিন্তু যে বিষয়টি আমাকে আরো বেশি ভাবায় তা হলো, ডিজিটাল মাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো ব্যবহার করে বহু মানুষ যেমন প্রতিনিয়ত জেনে-না জেনে ও বুঝে-না বুঝে মিথ্যা ও ভুল তথ্য ছড়াচ্ছে, বিভ্রান্ত করছে, ঘৃণা ও সংঘর্ষের চাষাবাদ করছে, তেমনি আমরাই আবার ভার্চুয়াল জগতকে প্রতিনিয়ত গুলিয়ে ফেলছি বাস্তব জীবনের সাথে।

ঠিক এ কারণেই আমাদের সকল কর্মকাণ্ড, সচেতনতা, আন্দোলন, বিদ্রোহ, বিপ্লব সবই এখন দানা বাঁধছে ডিজিটাল মাধ্যমে। আমরা অন্ধের মতো বিশ্বাস করতে শুরু করেছি সামাজিক মাধ্যমে যা ঘটছে তাই সত্য, একমাত্র সত্য। আমরা বাস্তব জগতের সাথে ভার্চুয়াল জগতকে গুলিয়ে ফেলেই শান্ত হচ্ছি না, বরং ভার্চুয়াল জগত আমাদের মনস্তত্ত্বকে এমনভাবে আকৃতি প্রদান করছে, যেখানে বাস্তব জগতটাই বরং মিথ্যা প্রতীয়মান হচ্ছে। বড়ই দুঃখজাগানিয়া!

তো, এই অবস্থায় ওসি হারুনের সংলাপেই বরং ফেরা যেতে পারে,

সকল মিথ্যাই মিথ্যা। সকল সত্য সত্য নহে। সবার চোখে যেটা সত্য, সেটা সত্য নাও হতে পারে।

বাস্তব জগতে তো বটেই, ভার্চুয়াল জগতের ক্ষেত্রে ওসি হারুনের এই সংলাপ সমধিক প্রযোজ্য। তাই এই দুইটা কথা মনে রাখা জরুরিই বটে!

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।