শিবলী নোমান

ট্রাম্পীয় প্যারাডক্স!

শিবলী নোমান

২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনের প্রার্থীদের ভিতর দ্বিতীয় দফা বিতর্ক হয়ে গেলো সোমবার। মিসৌরির সেন্ট লুইসের ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত এই বিতর্ককে অনেকে উল্লেখ করেছেন নির্বাচনের দৌঁড়ে রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেঁচে থাকার লড়াই হিসেবে। তবে বিতর্কের দুইদিন আগে ফাঁস হওয়া ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক ভিডিওর ফলেই অনেকে নির্বাচনে ট্রাম্পের শেষ দেখে ফেলেছেন। ২০০৫ সালে নারীদের সম্পর্কে কটুক্তি করার সেই ভিডিও ওয়াশিংটন পোস্টের মাধ্যমে ফাঁস হওয়ার পর অনেক রিপাবলিকান নেতাও এখন আর ট্রাম্পের পক্ষে প্রচারণা চালাতে চাইছেন না। আবার সম্ভব না হলেও অনেকেই রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট প্রার্থী বদলের দাবিও করেছেন। প্রার্থীর মৃত্যু বা স্বেচ্ছায় সরে না দাঁড়ালে অন্য কোন উপায়ে প্রার্থী বদলের ক্ষেত্রে যে অসংজ্ঞায়ন আছে তার ফলেই এই দাবি উঠলেও এই অন্য কোন কারণের অসংজ্ঞায়নের কারণেই এই পথটি রুদ্ধ হয়ে গিয়েছে। অন্যদিকে কোনভাবেই নির্বাচন থেকে সরে না আসার ঘোষণা আগেই দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

এ বছরের জুনে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে যুক্তরাজ্যের বেরিয়ে আসা তথা ব্রেক্সিটের সিদ্ধান্তের ফলেই ট্রাম্পের নির্বাচিত হওয়ার কথাটি বেশ যুক্তিযুক্তভাবে চিন্তায় আসে। ইউরোপ জুড়েই অভিবাসনবিরোধী যে কট্টর ডানপন্থী শক্তির উত্থান ইতিমধ্যেই লক্ষ্য করা গিয়েছে তার ঢেউ যে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনেও আছড়ে পড়বে তা সহজেই অনুমেয় ছিল। এরপর হিলারি-ট্রাম্প প্রথম বিতর্কের পর অল্পতেই ট্রাম্পের মেজাজ হারানো এবং জরিপে ট্রাম্পের শোচনীয় পরাজয়ের পরও আমার মনে হয় নি যে ট্রাম্প তখনই হেরে গিয়েছেন। যদিও বারংবার ট্রাম্পের হেরে না যাওয়ার কথা বলা কিংবা ব্রেক্সিটের রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে ট্রাম্পের নির্বাচিত হওয়ার কথা বললেও একে ট্রাম্পের প্রতি আমার সমর্থন বা ‘সফট কর্ণার’ হিসেবে আখ্যায়িত করলে তা ভুল ছাড়া কিছু হবে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন বলেই আমরা বছর দেড়েক আগে থেকে এ বিষয়ে আলোচনা করছি এবং নির্বাচনের এক মাস আগে এসে এই আলোচনা তুঙ্গে উঠেছে। কিন্তু বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে এই নির্বাচনে আমি কাউকে সমর্থন প্রদানের প্রয়োজন মনে করি না কারণ আমি দেখেছি মার্কিন নির্বাচনগুলোতে মূল আলোচনা হয়ে থাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আভ্যন্তরীন ইস্যু নিয়ে। পররাষ্ট্র ক্ষেত্রে খুব বেশি মতের অমিল ডেমোক্রেট বা রিপাবলিকানদের ভিতর হতে দেখি না যদিও এ নিয়ে তাদের তর্ক কিংবা বাহাসের শেষ নেই।

তাই নির্বাচনে কাউকে সমর্থন প্রদানের অপ্রয়োজনীয় আলোচনাকে দূরে রেখে আসুন হিলারি-ট্রাম্প বিতর্কে ফিরে যাই। দ্বিতীয় দফা বিতর্কটি আমি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দেখেছি। আমার মনে হয়েছে ট্রাম্প প্রথম বিতর্কের চেয়ে অনেকি বেশি ভালো করেছেন এবং সবচেয়ে ভালো করেছেন সহজেই মেজাজ না হারিয়ে। যদিও আমার মনে হয়েছিল এই বিতর্কে দুই প্রার্থীর জয়ের সম্ভাবনা প্রায় সমান, কিন্তু বিতর্ক পরবর্তী জরিপের ফলাফল দেখে আমি বেশ অবাকই হয়েছি। ইউগভের অনলাইন জরিপে ৪৭ ভাগ ভোটার হিলারির পক্ষে এবং ৪২ ভাগ ভোটার ট্রাম্পের জয়ের কথা বলেছেন। কিন্তু সিএনএন ও ওআরসির জরিপ বলছে ৫৭ ভাগ ভোটার হিলারির পক্ষে ও ৩৪ ভাগ ভোটার ট্রাম্পের জয়ের পক্ষে বলেছেন। তবে উভয় ক্ষেত্রেই এটি স্পষ্ট যে ট্রাম্প আগের বিতর্কের চেয়ে এবার ভালো করেছেন। আবার সিএনএন ও ইউগভ উভয়ের জরিপেই হিলারির নির্বাচনে জয়ের সম্ভাবনা এক শতাংশ কমে গিয়েছে।

কিন্তু মজার বিষয় হল, এই বিতর্ককে ইতিহাসের অন্যতম ‘কদর্য’ বিতর্ক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একের পর এক ব্যক্তিগত আক্রমণ আমরা দেখেছি এই বিতর্কে। কিন্তু আরেকটি বিষয় হল, এই বিতর্কে হিলারির প্রতি ট্রাম্প যেসব অভিযোগ এনেছেন তার বিপক্ষে সুস্পষ্ট কোন প্রমাণ হিলারি দেখাতে পারেন নি। তিনি এসব অভিযোগকে মিথ্যা বলে ট্রাম্পের প্রতি অভিযোগ তুলে ধরেছেন। অন্যদিকে হিলারি বারংবার রাশিয়ার বিপক্ষে কথা বলেছেন এবং ট্রাম্পকে প্রশ্নই করা হয়েছে উইকিলিকস তাকে সমর্থন করছে কিনা। ট্রাম্প এটি নাকচ করে দিলেও সম্প্রতি হিলারির ৩৩ হাজার ই-মেইল ফাঁস ও ওয়াল স্ট্রিটের সাথে হিলারির যোগাযোগের কথা প্রকাশ করে উইকিলিকস ট্রাম্পের পক্ষে না গেলেও স্পষ্টতই হিলারির বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে ওবামা প্রশাসনের সাথে ক্রেমলিন ও পুতিনের সম্পর্কের জের ধরেই হিলারির সাথে পুতিনের সুসম্পর্কের কোন আভাস নেই। তবে এর মানে এই নয় যে ট্রাম্প রাশিয়ার পক্ষে কিছু কথা বললেই বা তিনি নির্বাচিত হলেই যে রাশিয়ার সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দারুন সম্পর্ক হয়ে যাবে। যদি তা আশা করা হয় তবে তার মানে হবে বোকার স্বর্গে বাস করা।

এখন এতগুলো জটিলতার ভিতর কোনভাবেই বলা সম্ভব নয় যে আট নভেম্বরের নির্বাচনে আসলে কী হতে যাচ্ছে। একের পর এক জরিপে বারংবার হিলারির বিজয়ের কথা বলা হলেও নির্বাচনী জরিপ নিয়ে গবেষণার ফলাফল থেকেই আমরা বলতে পারি যে, জরিপ যাই বলুক, শেষ মূহুর্তে ‘অপিনিয়ন লিডার’ বা মতমোড়লদের সিদ্ধান্ত একটি বড় ফ্যাক্টর হিসেবে উঠে আসতে পারে। যে কোন নির্বাচনেই ‘সুইং ভোট’-ই যেহেতু ফল নির্ধারণ করে দেয়, তাই ‘সুইং ভোট’-এর সমর্থন আদায় ও মতমোড়লদের দৃষ্টি আকর্ষণ যিনি করতে পারবেন তিনিই শেষ হাসি হাসবেন তা বলে দেয়া খুব সহজ। তাই এখন খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, মার্কিন সমাজে বর্তমানে যারা মতমোড়ল তারা কী ধরণের মানসিকতা লালন করেন তা অনুধাবনের চেষ্টা করা। ট্রাম্পের চিন্তা বা কর্মপরিকল্পনা, যা এখন পর্যন্ত তিনি বলেছেন, তার প্রতি যদি সেই মতমোড়লদের সমর্থন থাকে তাহলে এখন পর্যন্ত পরিচালিত যে কোন জরিপ যে কোন সময় বাতিল হয়ে যেতে পারে। তাই নির্বাচনের ফলাফল না দেখেই আমি বলে দিতে চাই না যে ডোনাল্ড ট্রাম্প হেরে গিয়েছেন। বরং ট্রাম্পের ইতিমিধ্যেই হেরে যাওয়া নিয়ে যে আলোচনা সেটিকে প্যারাডক্স হিসেবেই ধরে নিচ্ছি কিছু সময়ের জন্যে।

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।