শিবলী নোমান

পানামা পেপারসের খসড়া তুলনামূলক আলোচনা

শিবলী নোমান

পানামা পেপারস নিয়ে বেশ আগ্রহ তৈরি হয়েছে প্রথম থেকেই। আগ্রহের বশবর্তী হয়েই চোখের সামনে পানামা পেপারস কিংবা পানামা পেপারস সম্পর্কিত যা পাচ্ছি পড়ার বা দেখার চেষ্টা করছি। এখন পর্যন্ত পানামা পেপারস সংক্রান্ত ঘটনাবলির ফলাফল হিসেবে সাধারন দৃষ্টিতে যেসব বিষয়কে ধরা হচ্ছে সেগুলোই আসল নাকি এগুলো এক ধরণের ধাপ্পা বুঝার চেষ্টা করছি। আবার পানামা পেপারসের বিপক্ষে যা বলা হচ্ছে তাও দেখছি আগ্রহ নিয়ে। ঘটনা হচ্ছে, কিছুই আসলে বুঝতে পারছি না। অন্যদিকে টুইটার বিষয়টা ভালো করে বুঝতে পারার অদক্ষতার কারণে উইকিলিকসের পানামা পেপারস সংক্রান্ত টুইটগুলো দ্যর্থোক মনে হচ্ছে। এসব কারণে আগ্রহ বোধ করছি আরো বেশি।

সাধারনভাবে যেটা মনে করা হচ্ছে যে পানামা পেপারস নামে পরিচিত মোসাক ফনসেকার এসব নথি ফাঁসের ঘটনা উইকিলিকস কিংবা এডওয়ার্ড স্নোডেনের তথ্য ফাঁসের মতই একটি ঘটনা। যারা এটি ভাবছেন তাদের সম্ভবত ঘুম থেকে উঠে একবার গা ঝাঁড়া দিতেই হবে। উইকিলিকসের ফাঁস করা তথ্য যেগুলো গার্ডিয়ান, নিউইয়র্ক টাইমসসহ পাঁচটি সংবাদপত্রে প্রথম প্রকাশিত হয় সেই সব সংবাদগুলো উইকিলিকস তাদের নিজস্ব সাইটেও রেখেছিল। নতুনত্ব ছিল সেখানে এই বিষয়ে যে, ফাঁস হওয়া নথির ভিত্তিতে যে সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছিল তার সাথেই ফাঁসকৃত নথিটি সাধারণ মানুষের পড়ার জন্যে উন্মুক্ত করা হয়েছিল। একটি কিংবা দু’টি নয়, প্রতিটি নথি উন্মুক্ত করেছে উইকিলিকস। জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ একে বলেছিলেন ‘সায়েন্টিফিক জার্নালিজম’। এখন আমরা যারা ভাবছি পানামা পেপারসও উইকিলিকসের মতই তথ্য ফাঁস, তারা যদি আমার কথা মত ঘুম থেকে উঠে গা ঝাঁড়া দিয়ে থাকেন তাহলে খেয়াল করবেন যে পানামা পেপারসের ফাঁসকৃত তথ্যের প্রকৃত নথিগুলো ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টস (আইসিআইজে) প্রকাশ করে নি। শুধু প্রকাশ করে নি তাই নয় বরং বলে দিয়েছে যে তার উইকিলিকসের মত এগুলো প্রকাশ করবে না। তারা বলতে চায় উইকিলিকস যা করেছে সেটি দায়িত্বশীলতা নয়। আবার ফাঁস হওয়া নথির মাত্র এক শতাংশ প্রকাশ করে আর বাকি ৯৯ শতাংশ গোপন করে আইসিআইজে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার কোন দিক উন্মোচন করতে চাইছে তা নিয়েও প্রশ্নের অবকাশ থেকে যায়, যদি করতে চান।

দ্বিতীয় আলোচনার বিষয় হল ভ্লাদিমির পুতিনকে পানামা পেপারসে জড়ানো এবং ফাঁস হওয়া নথিতে আমেরিকানদের নাম না থাকা। ইউক্রেন সঙ্কট, সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ ও আইএস দমনে রাশিয়া তথা পুতিনের উত্তরোত্তর সাফল্যে এ কথা স্বীকৃত যে পুতিন স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী রাশিয়ার ভঙ্গুর রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে শুধু সফলভাবে মোকাবেলাই করেন নি বরং আরেকটি স্নায়ুযুদ্ধের বাস্তবতা কিংবা ক্ষেত্র তৈরি করেছেন কিংবা তৈরি করতে বহুদূর এগিয়ে গিয়েছেন। এখন স্নায়ুযুদ্ধের নাম শুনে আমরা যদি ভেবে নেই আরেকটি সোভিয়েত রাশিয়ার কথা তাহলে ঠান্ডা মাথা বিষয়টি ভাবার প্রয়োজনের কথা বলতেই হবে। আমরা ভুলে যেতে পারি না যে পুতিনের নেতৃত্বে যে রাশিয়া মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে সেটি পুঁজিবাদী রাশিয়া। পুঁজিবাদের ফলাফল হিসেবে সেখানে বুর্জোয়া শ্রেণী গড়ে উঠবে এবং এই বুর্জোয়া শ্রেণীর শাসক শ্রেণীর আশেপাশে থাকাই স্বাভাবিক। তাই পুতিনের আশেপাশে থাকা ব্যক্তি কিংবা তার বন্ধুরা অফশোর ব্যবসার সাথে যুক্ত এটি অবিশ্বাসের কোন কারণ দেখছি না। আবার পুতিন এর সাথে যুক্ত এটি বিশ্বাসের কারণও দেখছি না কারণ তার নাম তালিকায় নেই। কিন্তু তার নাম না থাকার পরও দেশী-বিদেশী সংবাদপত্রে অন্যান্য দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের কর ফাঁকির নথি ফাঁস হওয়ার পরও তাদের স্থলে পুতিনের ছবি প্রকাশের বিষয়টি মগজে এই বার্তাই দিতে চায় যে, পুতিনকে লক্ষ্য করেই পানামা পেপারসের নাটক সজ্জিত। কারণ দিনশেষে একটি ছবি শ’খানের শব্দের চেয়ে শক্তিশালী!

আবার পানামা পেপারসে আমেরিকানদের নাম না থাকার বিষয়ে এটি বলে নেয়া ভালো যে, বিশ্বব্যাপী পানামাই একমাত্র ট্যাক্স হেভেন নয়। সমাজতাত্ত্বিক সলিমুল্লাহ খান গত ১০ এপ্রিল একটি টক-শোতে সাইপ্রাস, লেবানন, সিঙ্গাপুর, হংকং, ভার্জিন আইল্যান্ডসসহ অন্যান্য ট্যাক্স হেভেনের নাম উল্লেখ করেছেন। পানামা পেপারসে আমেরিকানদের নাম না থাকার কারণ হিসেবে দু’টি মতামত দেখতে পাচ্ছি। প্রথমত, আমেরিকানরা অফশোর কোম্পানি সাধারণত ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসে প্রতিষ্ঠা করে থাকে তাই পানামা পেপারসে তাদের নাম আসার সম্ভাবনা কম। কিন্তু পানামা পেপারসে ফাঁসকৃত অফশোর কোম্পানির তথ্যের অদ্ধিকাংশই ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডের কোম্পানি বলে এই যুক্তি খুব বেশি শক্তিশালী মনে হচ্ছে না। এর সম্পূরক যুক্তি হিসেবে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের কথ আলোচিত হচ্ছে। কারণ পানামা পেপারস ফাঁস করা প্রতিষ্ঠান অর্থাৎ আইসিআইজে নিজেদের নন-প্রফিট অর্গানাইজেশন দাবি করে ঠিকই কিন্তু নিয়মিত অর্থ সহায়তা গ্রহণ করে রকফেলার ফাউন্ডেশনের মত প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে। দ্বিতীয়ত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাস্ট ও ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠার আইনগুলো এমন যে ট্রাস্ট বা ফাউন্ডেশন তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্রের ভিতরই কর ফাঁকির সুযোগ রয়েছে। অর্থাৎ আমেরিকান পুঁজিপতিদের জন্যে আমেরিকা স্বয়ং একটি ট্যাক্স হেভেন। তাই পানামা পেপারস ঘাটলে আমেরিকানদের পাওয়া কঠিন।

সর্বশেষ বিষয় পানামা নিয়ে। যদিও পানামা নিয়েই আগে আলোচনা করা প্রয়োজন। সাধারণ প্রশ্ন এটিই যে এত দেশ থাকতে পানামা কেন? আর পানামারই বা এ কেমন নীতি যে তার দেশে যে কেউ গিয়ে অফশোর কোম্পানি খুলতে পারবে? ১৯০৩ সালে কলম্বিয়ার থেকে পানামা স্বাধীনতা পায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায়। এই সহায়তার বিনিময় হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র পায় পানামা খালের ইজারা, যা বলবৎ ছিল ১৯৯৯ পর্যন্ত। যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় পানামা রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব পেলেও যুক্তরাষ্ট্রে দখল করে পানামার অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব, কিংবা পরিণত হয় নব্য মার্কিন উপনিবেশে। যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে পানামা একমাত্র দেশ যেখানে শতভাগ ডলার অর্থনীতি চলে। পানামায় কোন কেন্দ্রীয় ব্যাংক নেই কারণ তারা যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের সাথে যুক্ত থেকে নিজেদের অর্থনৈতিক কার্যক্রম চালায়। বিশ্বায়ন ও মুক্ত বাজার অর্থনীতির হুজুগে পানামা তার দেশে ডলারের জোগান বাড়ানোর উপায় হিসেবে তার দেশে অফশোর কোম্পানি প্রতিষ্ঠার সুযোগ দেয়। এমনভাবেই আইন করা হয় যেখানে পানামার মানুষের সাথে ব্যবসা করতে হলে পানামা সরকারকে কর দিতে হবে, কিন্তু পানামায় ব্যবসা করলেও পানামার বাইরের মানুষের সাথে ব্যবসা করলে পানামা সরকারকে কোন কর দিতে হবে না। আর এর ফলেই বিশ্বের বিভিন্ন এলাকার মানুষ পানামায় প্রতিষ্ঠা করে অফশোর কোম্পানি। ফলে একদিকে পানামায় ডলারের প্রবাহ বাড়লো, অন্যদিকে মুক্ত বাজার প্রতিযোগিতায় ধনপতিদের প্রয়োজন হলো না সরকারকে কর দিয়ে নিজেদের প্রতিযোগিতাকে আরো কঠিন করে ফেলার।

পানামা পেপারস ফাঁসের বিষয়ে আরেকটি মতামত হল, যেহেতু ইউরোপীয় আইনেই অফশোর কোম্পানির বিধান রয়েছে আর মানুষ কর ফাঁকি দিতেই এটি করছে তাই ২০১৮ সাল নাগাদ করের হার কমিয়ে, প্রয়োজনে সেটি শূণ্য করে দেশের টাকা দেশে রাখার একটি নীতি ইউরোপে গৃহীত হতে পারে। এটি বাস্তবায়িত হলে অফশোর কোম্পানির অস্তিত্ব যেমন থাকবে না তেমনি প্রয়োজন হবে না বিভিন্ন ট্যাক্স হেভেনের। তাই উইকিলিকস কিংবা এডওইয়ার্ড স্নোডেনের ডকট্রিনের রূপে পানামা পেপারস ফাঁস করে অদূর ভবিষ্যতের সম্ভাব্য বাস্তবতা এবং বৈশ্বিক রাজনীতির মেরুকরণকে ম্যানিপুলেট করতেই পানামা পেপারস ফাঁস করা হলো কিনা তা নিয়ে ভাবতে হবে এখন থেকেই। তাই আবারো বলছি, পানামা পেপারস একটি প্যারাডক্সও হতে পারে!

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।