রিচার্ড এম এটন
ভাষান্তর: শিবলী নোমান
মুঘলদের চিহ্ন ছাড়া আধুনিক ভারতকে যে চিনতে পারাই সম্ভব নয়, একটি ঐতিহাসিক খামখেয়ালির পেছনে ছুটতে গিয়ে আজকের শাসকগণ সেই বাস্তবতাটিকে মুছে দিতে চান।
(প্রাক-আধুনিক ভারতের ইতিহাস বিষয়ে আগ্রহী গবেষক ও ইউনিভার্সিটি অব আরিজোনার অধ্যাপক রিচার্ড এম এটন-এর এই প্রবন্ধটি ২০২৫ সালের ১৭ জুলাই India’s war on the Mughal Empire শিরোনামে Engelsberg Ideas-এ প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে ০৯ আগস্ট, ২০২৫ তারিখ Richard Eaton: India’s self-destructive war on the deep roots of the Mughal Empire শিরোনামে প্রবন্ধটি প্রকাশ করে scroll.in। scroll.in-এ প্রকাশিত প্রবন্ধটি অনুসরণ করে বর্তমান ভাষান্তরটি করা হয়েছে। ওয়েবজিন যোগাযোগ-এর ঈদ-উল-ফিতর ২০২৬ সংখ্যায় অনুবাদটি প্রথম প্রকাশিত হয়।)
গত এপ্রিলে (২০২৫) ডেভিড রেমনিক লিখেছিলেন, “আর সব স্বৈরতন্ত্রের মতো এই প্রশাসনও কল্পিত অতীতের প্রতি এক রহস্যময় দৃষ্টিভঙ্গি লালনের পক্ষে দাবি উত্থাপন করে”। এর দ্বারা রেমনিক ট্রাম্পের আমেরিকাকে নির্দেশ করলেও, আজকের ভারত সম্পর্কেও একই ধরনের কথা বলা যেতে পারে। হিন্দুত্ববাদী আদর্শ দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে দেশটির বর্তমান শাসক দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এমন এক হিন্দু ‘স্বর্ণযুগ’-এর কল্পনা করে, যেখানে মুসলিম বহিরাগতদের দ্বারা তাদের কল্পিত পবিত্র রাজ্য আক্রমণ ও দখল করে নেয়ার ফলে হিন্দুবিরোধী সহিংসতা ও অত্যাচারের এক দীর্ঘ ও হতাশাপূর্ণ ‘অন্ধকার যুগ’-এর সূচনা হয়েছিল।
এক হাজার বছরের মুসলিম শাসন ও ব্রিটিশরাজের ২০০ বছরের শাসনকে নির্দেশ করে ২০১৪ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছিলেন যে ভারত ১,২০০ বছরের ‘দাসত্ব’ ভোগ করেছে। কিন্তু এক্ষেত্রে ইংরেজদের নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার শুভ উপলব্ধি থাকলেও, মুসলমানরা কখনোই সেই ভূমি ত্যাগ করে নি। আর বলা হয়ে থাকে, এই ভূমি তারা ধ্বংস ও লুণ্ঠন করেছিল। খুব কম করে বললেও, ভারতের ইতিহাস আসলে একটি রাজনৈতিক বিস্ফোরকে পরিণত হয়েছে।
ষোড়শ শতকের শুরুর দিক থেকে অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত, অর্থাৎ সেই ১২ শতকের কথিত ‘দাসত্ব’-র শেষের দিকে দক্ষিণ এশিয়ার অধিকাংশ অঞ্চলজুড়ে মুঘল সাম্রাজ্যের আধিপত্য ছিল। এটি ছিল এক মুসলিম রাজবংশ দ্বারা শাসিত এক চমকপ্রদ রাষ্ট্রব্যবস্থা, যা কিছু সময়ের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ও সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল। যদিও ১৮৫৮ সালে রাণী ভিক্টোরিয়া কর্তৃক বিলুপ্তির আগের একশত বছর ধরে এই সাম্রাজ্য পতনমুখী ছিল, তবুও মুঘলরা ভারতের সমাজ ও সংস্কৃতিতে যে ছাপ ফেলে গিয়েছে এবং এখনো রেখে চলেছে, সেগুলো ছাড়া আজকের ভারতকে চেনা সম্ভব হতো না। কারণ, মুঘলরাই ইতিহাসে প্রথমবারের মতো দক্ষিণ এশিয়ার অধিকাংশ এলাকাকে রাজনৈতিকভাবে একীভূত করেছিল।
১৯৪৭ সালের পর থেকে প্রতি ১৫ই আগস্ট, অর্থাৎ ভারতের স্বাধীনতা দিবসে, দেশটির প্রধানমন্ত্রী মুঘল শক্তির সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীক তথা ১৬৪৮ সালে নির্মিত দিল্লির বৃহৎ লালকেল্লার দুর্গপ্রাচীর থেকে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেয়ার মাধ্যম নিজেদের অজান্তেই মুঘলদের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে স্বীকার করে আসছেন। আধুনিক ভারতের অধিকাংশ প্রশাসনিক ও আইনি অবকাঠামো মুঘল চর্চা ও পদ্ধতিসমূহ থেকে এসেছে। আজকের ভারতের মুদ্রাব্যবস্থার ভিত্তি যে রুপি, মুঘলরাই সেই ব্যবস্থার স্বাভাবিকীকরণ করেছিল। ভারতীয় পোশাক, স্থাপত্য, ভাষা, শিল্প ও বাচনভঙ্গি, এ সবই মুঘল চর্চা ও সংবেদনশীলতা দ্বারা পূর্ণতা পেয়েছে।
সেতার, তবলা বা সরোদ ছাড়া ভারতীয় সঙ্গীত কল্পনা করাও কঠিন। ভারতে হোক বা ভারতের বাইরে, প্রায় সকল ভারতীয় রেস্তোরাঁয় তন্দুরি মুরগি, কাবাব, বিরিয়ানি বা শাহী পনির থাকবেই। মুঘলদের দাপ্তরিক ভাষা ফারসি থেকে নেয়া শব্দ ব্যবহার না করে উত্তর ভারতীয় ভাষায় একটি সম্পূর্ণ বাক্য কদাচিত বলা যায়। ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় বিনোদন মাধ্যম বলিউডের চলচ্চিত্র উর্দু সংলাপ ও গানে পরিপূর্ণ থাকে। উর্দু হলো সেই ভাষা, মুঘল দরবারের দেশীয় ব্যক্তিদের ভেতর যার শেকড় প্রোথিত ছিল। আর সাম্রাজ্যের পৃষ্ঠপোষকতা ও রাজবংশের প্রধান রাজধানী দিল্লির প্রতিপত্তির সাথে সম্পর্কের কারণে এই ভাষাটি সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়েছিল।
এসব সত্ত্বেও, এবং দিল্লির লালকেল্লায় দাঁড়িয়ে জাতির উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী প্রদত্ত ভাষণ সত্ত্বেও, ভারত সরকার জনমানুষের চেতনা থেকে যতদূর সম্ভব মুঘলদের মুছে ফেলার এক দৃঢ় প্রচেষ্টায় নিয়োজিত রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তারা জাতীয় পাঠ্যক্রম অনুসরণকারী সকল বিদ্যালয়ে মুঘল ইতিহাস বিষয়ে পাঠদান মারাত্মকভাবে সীমিত করার পাশাপাশি, কোন কোন ক্ষেত্রে বাতিলও করেছে।
মুঘলদের ইতিহাস সম্পর্কিত বিষয়াদি সপ্তম শ্রেণির (প্রায় ১২ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের জন্য) পাঠ্যক্রম থেকে সম্পূর্ণভাবে বাদ দেয়া হয়েছে, অষ্টম শ্রেণিতে কিছুটা রাখা হয়েছে, নবম থেকে একাদশ শ্রেণির পাঠ্যক্রমে এ বিষয়ে কিছুই নেই, আবার দ্বাদশ শ্রেণিতে এই ইতিহাসের একটি সংক্ষিপ্ত সংস্করণ এখনো রাখা হয়েছে। ১৬৫৩ সালে নির্মিত মুঘল স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন ও বিশ্বের অন্যতম গৌরবোজ্জ্বল সম্পদ তাজমহলের কোন উল্লেখ ব্যতিরেকেই ২০১৭ সালে একটি সরকারি পর্যটন প্রচারপত্র তৈরি করা হয়েছিল। এমনকি আগ্রার আইনজীবীদের একটি দল এই স্থাপত্যটিকে হিন্দু মন্দির হিসেবে ঘোষণা করার জন্য আদালতে আবেদন পর্যন্ত করেছেন।
এ ধরনের মৌলবাদী পদক্ষেপগুলো সফলতা পেতে ব্যর্থ হলেও, ভারত সরকার মুঘলদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে স্মৃতিসৌধটিকে হিন্দু সংবেদনশীলতার সাথে চিহ্নিত করার লক্ষ্যে আরও সূক্ষ্ম প্রচেষ্টা চালিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, কর্তৃপক্ষ আরামবাগ নামে পরিচিত তাজমহলের নিকটস্থ একটি বাগানের নাম পরিবর্তন করে রামবাগ রেখেছে। ফলে বাগানটির নামের অর্থ “শান্তির বাগান” থেকে “রামের বাগান”-এ পরিণত হয়েছে, আর রাম একজন জনপ্রিয় হিন্দু দেবতা। এই একই দেবতার জন্য ভারতের বর্তমান সরকার বাবরি মসজিদের স্থানে সম্প্রতি জমকালো এক মন্দির চত্বর তৈরি করেছে। ১৫২৮ সালে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট বাবর পূর্ব ভারতের এই মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন এবং ১৯৯২ সালে হিন্দুত্ববাদী কর্মীদের একটি দল এটি ধ্বংস করে দেয়।
উপরোক্ত বিষয়গুলো পরস্পর সম্পর্কিত দুইটি প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে। প্রথমত, সমৃদ্ধ ও ফারসিপ্রভাবিত মুঘল সংস্কৃতি কীভাবে আজকের ভারতের এত গভীরে নিজ শেকড় গাড়তে সক্ষম হয়েছিল? দ্বিতীয়ত, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কে সেই সংস্কৃতির স্মৃতিসমূহ এমন অবদমনের মুখে পড়েছে?
ত্রয়োদশ শতকের শুরুর থেকে সামগ্রিকভাবে দিল্লি সালতানাত নামে পরিচিত রাজবংশসমূহ ধারাবাহিকভাবে উত্তর ভারতীয় অঞ্চিলে আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছিল। জাতিগতভাবে আফগান লোদি রাজবংশ ছিল এই রাজবংশগুলোর ভেতর সর্বশেষ। আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব জহিরউদ্দিন বাবর (১৪৮৩-১৫৩০) লোদী রাজবংশকে উৎখাত করেছিলেন। ১৫২৬ সালে বাবর তাঁর কাবুলের ঘাঁটি থেকে সিংহভাগ জন্মগতভাবে স্বাধীন তুর্কি অনুচর দিয়ে গঠিত এক সেনাবাহিনী নিয়ে খাইবার পাস হয়ে প্রশস্ত সিন্ধু-গাঙ্গেয় সমভূমিতে প্রবেশ করেন, যার ফলশ্রুতিতে মুঘল সাম্রাজ্যের সূচনা ঘটে।
সুলতানী শাসনের মতো নতুন এই সাম্রাজ্যের সাফল্যও দিল্লি ও লাহোরকে কাবুল, বালখ এবং সমরকন্দ ও বুখারার মতো মধ্য-এশিয় বাজারের সাথে সংযোগকারী প্রাচীন বাণিজ্যপথসমূহ নিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভরশীল ছিল। বহু শতাব্দী ধরে, তুলা ও অন্যান্য ভারতীয় পণ্য এই পথেই উত্তর দিকে যেতো, আর ঘোড়া যেতো দক্ষিণে দক্ষিণ এশিয়ার বাজারগুলোতে। বাবরের সময় পণ্য হিসেবে বার্ষিক এক লক্ষেরও বেশি ঘোড়া এই পথ ব্যবহার করে স্থানান্তরিত হতো। দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের ঘোড়া দেশীয় হাতির পাশাপাশি ভারতীয় রাজ্যসমূহের যুদ্ধশক্তির ভিত্তি তৈরি করেছিল। কিন্তু ভারতীয় শাসকদের পছন্দের বৃহৎ ও শক্তিশালী ঘোড়া অন্যান্য অঞ্চল থেকে আমদানি করতে হতো। এ ধরনের ঘোড়া মূলত মধ্য এশিয়া থেকে নিয়ে আসা হতো, যেখানে দীর্ঘ ঘাসসমৃদ্ধ বড় বড় তৃণভূমিতে স্থানীয় ঘোড়ার পাল স্বাধীনভাবে বিচরণ করতো।
দিল্লি, আগ্রা ও লাহোরকে কেন্দ্র করে একটি নতুন রাজ্য প্রতিষ্ঠাকারী বাবর তার বংশধরদের জন্য রেখে যান তৈমুরীয় মধ্য এশিয়ার বিশ্বজনীন দুনিয়ার সাথে এক মজবুত সংযোগ, এক পরিশীলিত নান্দনিক সংবেদনশীলতা, প্রাকৃতিক পরিবেশের প্রতি ভালোবাসা (যা তাঁর হৃদয়গ্রাহী স্মৃতিকথা বাবরনামা-য় প্রতিফলিত হয়) ও বাগানের প্রতি অনুরাগ। মধ্য এশিয়ার নিজ জন্মভূমির অনুকরণে ভারতেও সতেজ ও স্বর্গীয় স্থানসমূহ সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়ে বাবর তাঁর রাজ্যজুড়ে বাগান তৈরি করেছিলেন। তাঁর বংশধররা এই চর্চা অব্যাহত রেখেছিলেন, আর তারই চূড়ান্ত পরিণতি ছিল তাজমহল।
ভারতে আগমনের মাত্র চার বছর পরে বাবর মৃত্যুবরণ করায়, তাঁর এই নতুন রাজ্য পরাজিত লোদি বংশের বহু প্রতিষ্ঠানকে অব্যাহত রেখেছিল। যেমন, নিজের সর্বাপেক্ষা বিশ্বস্ত অনুচরদের ভেতর কর আদায়ের জন্য জমি বরাদ্দ করা, একই সাথে এসব স্থান থেকে তারা রাজ্যের জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যক অশ্বারোহী বাহিনীও গঠন করতো। বাবরের পুত্র হুমায়ুন (শাসনকাল ১৫৩০-৪০, ১৫৫৫-৫৬) ভারতীয় মাটিতে মুঘল শাসনের শেকড় গভীর করার জন্য প্রথম পদক্ষেপ নেন। যেমন, তিনি মধ্য এশীয় তুর্কির পরিবর্তে একজন ভারতীয় মুসলিম জমিদারের কন্যাকে বিয়ে করেন। তিনি তার অভিজাতদেরকেও এই চর্চা অনুসরণ করতে উৎসাহিত করেছিলেন।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, হুমায়ুন তার প্রাসাদের বাইরের দেয়াল থেকে প্রসারিত একটি উঁচু মণ্ডপে বসে ভোরের উদীয়মান সূর্যকে অভিবাদন জানাতেন এবং সাধারণ জনগণকে তাঁর মুখ দেখাতেন, ঠিক যেমন সূর্য তার চেহারা দেখাতো হুমায়ুনকে। এর মাধ্যমে ভারতীয় রাজাদের এক প্রাচীন প্রথাকে অনুসরণ করা হয়েছিল, যা সূক্ষ্মভাবে একজন ক্ষমতাসীন রাজার চিত্রকে এক ব্রাহ্মণ্যবাদী দেবতার মূর্তির সাথে সম্পর্কিত করেছিল, একে অপরের চোখে চোখ রেখে যোগাযোগের মাধ্যমে যার সামনে সম্মানসূচক ভক্তি প্রদর্শন করা হয়।
হুমায়ুনের পুত্র আকবরের (শাসনকাল ১৫৫৬-১৬০৫) দীর্ঘ শাসনামলে মুঘলদের আরও বেশি ভারতীয়করণ ঘটে। পূর্বের তিনশত বছর ধরে দিল্লির সুলতানদের যেখানে উত্তর ভারতের রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তারকারী রাজপুত যোদ্ধা বংশগুলোকে পরাজিত করতে বেগ পেতে হচ্ছিলো, সেখানে আকবর রাজপুতদেরকে তাঁর অধীনস্থ রাজা হিসেবে আত্মীকৃত করার বিপরীত নীতি গ্রহণ করেছিলেন। প্রায় সব রাজপুত রাজা আকবর প্রণীত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন। এটি করার মাধ্যমে তাঁরা তাঁদের পূর্বপুরুষের ভূমিতে নিজ রাজত্ব জারি রাখার পাশাপাশি আকবরের নবসৃষ্ট শাসকশ্রেণির ভেতর উচ্চতর পদবী ‘রাজসিক মনসবদার’ লাভ করতে পারতেন। তাঁদের এই নতুন পদমর্যাদা তাদেরকে নিছক প্রাদেশিক বিশিষ্টজন হিসেবে থাকার পরিবর্তে সর্বভারতীয় রাজনৈতিক মঞ্চের অংশ হওয়ার সুযোগও করে দিয়েছিল।
অধিকন্তু, তাঁদের ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছিল, হিন্দু মন্দির নির্মাণ ও পৃষ্ঠপোষকতার অধিকার এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। সময়ের সাথে সাথে মুঘল ও রাজপুত উভয় গোষ্ঠীর ভেতর একটি সাধারণ যোদ্ধা সংস্কৃতির উদ্ভব ঘটে, যা ধর্মীয় পরিচয়কে অতিক্রম করে যায় এবং পরবর্তী সময়ে রাজপুত যোদ্ধারা মুসলিম যোদ্ধাদেরকে সহযোদ্ধা রাজপুত হিসেবেই বিবেচনা করতে শুরু করে। এমনকি আকবরকে তাঁরা দেবতা রামের সমতুল্যও বিবেচনা করতে থাকে। বিনিময়ে রাজপুতদের সার্বভৌম অধিপতি হিসেবে আকবর ও তাঁর উত্তরসূরিগণ অধীনস্থ রাজবংশগুলো কর্তৃক নিয়মিত সম্মানসূচক অর্থ পরিশোধ, উত্তর ভারতের সেরা অশ্বারোহী বাহিনী ব্যবহার, গুজরাটের আকর্ষণীয় বাজারসমূহে পৌঁছানোর জন্য রাজস্থানী বাণিজ্যপথের মাধ্যমে সমুদ্রে প্রবেশাধিকার ও রাজসিক হেরেমে রাজপুত রাজকন্যাদের অন্তর্ভুক্তির মতো সুবিধাদি অর্জন করেছিলেন।
উল্লিখিত শেষ বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণিত হয়েছিল। যত বেশি সংখ্যক রাজপুত রাজ্য মুঘল আধিপত্যের কাছে নতি স্বীকার করে নিচ্ছিলো, সাম্রাজ্যিক দরবার ততই একটি বিশাল, বহু-জাতিগত ও নারীকেন্দ্রিক এক জগতে পরিণত হয়ে উঠছিল, যেখানে রাজপুত উপাদান ধীরে ধীরে অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর ওপর প্রভাব বিস্তার করছিল। উপরন্তু, রাজপুত নারীরা সম্রাটের বৈধ স্ত্রী হতে পারতেন বলে আকবরের সময় থেকে একজন রাজপুত মায়ের গর্ভে জন্ম নেয়া সম্রাটের সন্তান সিংহাসন লাভের যোগ্য বলে বিবেচিত হতে শুরু করে। উল্লেখ্য, আকবরের পুত্র জাহাঙ্গীর (শাসনকাল ১৬০৫-১৬২৩) আধা-রাজপুত ছিলেন, তাঁর মা ছিলেন এক রাজপুত রাজকন্যা। জাহাঙ্গীর নিজে রাজপুত শাসকদের সাত কন্যাকে বিবাহ করেছিলেন, যাদের ভেতর একজন ছিলেন তার উত্তরসূরি সম্রাট শাহজাহানের মাতা, ফলে তাঁদের বংশধর জৈবিকভাবে তিন-চতুর্থাংশ রাজপুতে পরিণত হয়।
রাজপুত মাতাদের মাধ্যমে হেরেমের ভেতরে বেড়ে ওঠা সন্তানরা তাদের মাতার সংস্কৃতির সাথে অনিবার্যভাবেই পরিচিত হতো। এর ফলে মুঘল সাম্রাজ্যের সংস্কৃতির গভীরে ভারতীয় সংবেদনশীলতা ও মূল্যবোধ প্রবিষ্ট হয়, যা প্রতিফলিত হয় মুঘল শিল্প, স্থাপত্য, ভাষা ও খাদ্যাভ্যাসে। একই সাথে, রাজপুত অশ্বারোহী বাহিনীর মুঘল সামরিক ব্যবস্থায় সংযুক্ত হওয়ার ফলে স্থানীয় সামরিক চর্চাসমূহ সমগ্র সাম্রাজ্যের সামরিক সংস্কৃতিতে ছড়িয়ে পড়তে সক্ষম হয়।
প্রকৃত অর্থে ভারতীয়, এমন সম্রাটদের মতো মুঘলরাও সংস্কৃত সাহিত্য ঐতিহ্যের সাথে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন এবং তাঁরা ব্রাহ্মণ ও জৈন পণ্ডিতদেরকে নিজেদের দরবারে স্বাগত জানাতেন। ১৫৮০-এর দশক থেকে আকবর সংস্কৃত মহাকাব্য মহাভারত ও রামায়ণের ফার্সি অনুবাদে পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন, যার ফলে রাষ্ট্র পরিচালনা সম্পর্কিত মুঘল ধারণায় ভারতীয় চিন্তাকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হয়। সংস্কৃত মহাভারত যেখানে মহাজাগতিক ও সামাজিক শৃঙ্খলা তথা ধর্মের ওপর জোর দিয়েছিল, সেখানে তার ফারসি অনুবাদ রাজার যথাযথ গুণাবলির ওপর জোর দেয়। একইভাবে, সংস্কৃত রামায়ণকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে মুঘল সার্বভৌমত্ব বিষয়ক একটি চিন্তায় রূপান্তরিত করা হয়েছিল, যেখানে মহাকাব্যের নায়ক রামকে স্বয়ং আকবরের সাথে যুক্ত করা হয়। যেন সম্রাট বিষ্ণুরই এক অবতার!
আকবরের সময় থেকে মুঘলরা চিকিৎসাশাস্ত্র ও জ্যোতির্বিদ্যার ক্ষেত্রেও সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণকে উৎসাহিত করেছিল। কারণ ইন্দো-ফারসি পণ্ডিতগণ ঔষধশাস্ত্র ও দেশীয় ভারতীয় উদ্ভিদের ব্যবহার সম্পর্কিত স্থানীয় বিদ্যা (আয়ুর্বেদিক) সম্পর্কিত কাজের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ায়, সপ্তদশ শতকের মধ্যভাগে এসে মুঘলদের গ্রেকো-আরব (ইউনানি) চিকিৎসা পদ্ধতির ভারতীয়করণ সম্পন্ন হয়েছিল।
একইভাবে, ষোড়শ শতকের শেষদিক থেকে ফারসি-সংস্কৃত অভিধানের মাধ্যমে সংস্কৃত পণ্ডিতগণ প্রকৃতির একরূপতা ও গতিসূত্র সম্পর্কিত প্রাচীন গ্রিক ধারণাদি থেকে উদ্ভূত আরব-ফারসি চিন্তাসমূহের সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান। শাহজাহানের পৃষ্ঠপোষকতায় তৈরিকৃত গ্রহসমূহের গতিবিধির ভবিষ্যদ্বাণী করতে সক্ষম জ্যোতির্বিদ্যার সারণীগুলির সাথে যুক্ত হয়ে এসব জ্ঞান বৃহত্তর মুঘল-রাজপুত শাসক শ্রেণির ভেতর ছড়িয়ে পড়ে।
ভারতের সাধারণ মানুষ কর্তৃক মুঘলদেরকে প্রকৃতপক্ষেই ভারতীয় হিসেবে গ্রহণ করে নেয়ার সর্বজনবিধিত ইঙ্গিত পাওয়া যায় অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতকে। এসময় মুঘলরা যখন সাম্রাজ্যের বাইরের শক্তির তরফ থেকে অস্তিত্বগত হুমকির মুখোমুখি হচ্ছিলো, তখন ভারতের স্থানীয় শক্তিগুলো দেশের একমাত্র বৈধ সার্বভৌম সত্ত্বা হিসেবে মুঘল সম্রাটের পাশে অবস্থান নিয়েছিল। ১৭৩৯ সালে পারস্যের দুর্ধর্ষ রাজা নাদির শাহ ভারত আক্রমণ করে এক বিশাল মুঘল বাহিনীকে পরাজিত করেন, দিল্লি দখল করেন ও সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক ময়ূর সিংহাসনসহ বিপুল লুণ্ঠিত সম্পদ নিয়ে ইরানে ফিরে যান।
ঠিক এই সময়ে মারাঠারা বুঝতে পেরেছিল যে মুঘলরাই ভারতীয় সার্বভৌমত্বের চূড়ান্ত প্রতীক এবং যে কোন মূল্যে তাদেরকে রক্ষা করতে হবে, যদিও এই মারাঠারাই বিগত কয়েক দশক ধরে ভারতে মুঘল আধিপত্য প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। মারাঠা প্রধানমন্ত্রী বাজিরাও (১৭০০-৪০) বিদেশি আক্রমণকারীদের কবল থেকে দুর্বল হয়ে পড়া মুঘলদের সমর্থন ও রক্ষার লক্ষ্যে উত্তর ভারতের সকল রাজনৈতিক অংশীজনদের সমন্বয়ে এক জোট গঠনের প্রস্তাব পর্যন্ত উত্থাপন করেছিলেন।
আবার, উনিশ শতকের মধ্যভাগে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি উপমহাদেশের সিংহভাগ এলাকার উপর কার্যত নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল। আর এ সময় মুঘল শাসক দ্বিতীয় বাহাদুরকে (শাসনকাল ১৮৩৭-৫৭) দিল্লির লালকেল্লায় কার্যত বন্দি ও এক নাম মাত্র সম্রাটে পরিণত করা হয়। কিন্তু ১৮৫৭ সালে কোম্পানির নিজস্ব ভারতীয় সৈন্যদের একটি অসন্তুষ্ট দল কর্তৃক উত্তর ভারতের মিরাটে অবস্থিত সেনানিবাসে থাকা ইংরেজ অফিসারদের হত্যার মাধ্যমে এক বিদ্রোহের সূচনা ঘটে। এই বিদ্রোহ ভারতজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে এমন আশা নিয়ে বিদ্রোহীরা সমর্থন খুঁজতে দিল্লির দিকে ছুটে যায় এবং এই ঘটনায় বিভ্রান্ত দ্বিতীয় বাহাদুরের পাশে সোৎসাহে সমবেত হয়। নিজের ও তাঁর সাম্রাজ্যের জরাজীর্ণ অবস্থা সত্ত্বেও, বিদ্রোহীদের কাছে বাবরের এই দুর্বল বংশধরই তখন পর্যন্ত ভারতের বৈধ সার্বভৌমত্বের প্রতীক হিসেবে বিদ্যমান ছিল।
উপরোল্লিখিত দুইটি ঘটনার সমসাময়িক, তথা মুঘল সাম্রাজ্যের গোধূলিলগ্নে জনগণের স্মৃতিতে একজন সম্রাট বিশেষভাবে পূজনীয় ছিলেন, তিনি হলেন আলমগীর (শাসনকাল ১৬৫৮-১৭০৭)। আজ তিনি তাঁর রাজকীয় নাম আওরঙ্গজেব হিসেবে ব্যাপকভাবে পরিচিত। তাঁর মৃত্যুর পর এক বৃহৎ ও শ্রদ্ধাবনত জনতা দাক্ষিণাত্যের মালভূমিজুড়ে ৭৫ মাইল দীর্ঘ শবযাত্রাকে অবলোকন করেছিল। এই শবযাত্রা চলছিল বর্তমান মহারাষ্ট্রের এক পবিত্র কবরস্থান খুলদাবাদের উদ্দেশ্যে। সেখানে, সম্রাটের অনুরোধ মোতাবেক তাঁর দেহ সমাহিত করা হয় খোলা আকাশের নিচে এক সাধারণ কবরে। এটি ছিল বাবর ব্যতীত তাঁর অন্যান্য পূর্বসূরিদের স্মৃতিকে মহিমান্বিত করে রাখার লক্ষ্যে নির্মিত দৃষ্টিনন্দন স্মৃতিসৌধগুলো থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ঘটনা।
আওরঙ্গজেবের সেই সাধারণ সমাধি খুব শীঘ্রই এক প্রচণ্ড জনপ্রিয় ভক্তির বস্তুতে পরিণত হয়েছিল। বহু বছর ধরে অদৃশ্য জগতের সাথে মধ্যস্থতার লক্ষ্যে আলমগীরের সুপারিশ অর্জনের জন্য মানুষ তার সমাধিস্থলে ভিড় করতো। কারণ, এটি বিশ্বাস করা হতো যে তাঁর ব্যক্তিত্বের পবিত্র প্রভাব তাঁর কবরকে আবৃত করে রাখে, জীবিত অবস্থায় এটি যেমন তার ব্যক্তিত্বে জড়িয়ে থাকতো। আর এ কারণেই নিজ জীবদ্দশায় সম্রাট আলমগীর জনমানুষের ভেতর পরিচিত ছিলেন ‘আলমগীর জিন্দা পীর’ নামে, যার অদৃশ্য শক্তি অলৌকিক সব কাজ করতে পারে।
১৭০৭ সালে আলমগীরের মৃত্যুর পরও একজন পবিত্র সম্রাট হিসেবে তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধি পেতে থাকে। ১৭০৯ সালে ভীমসেন সাকসেনা নামক সাম্রাজ্যের এক কর্মকর্তা আলমগীরের ধার্মিক চরিত্র ও সাম্রাজ্যের উদ্দেশ্যে অতিপ্রাকৃত শক্তিকে সংগঠিত করতে পারার ক্ষমতার প্রশংসা করেছিলেন। ১৭৩০ সালে ঈশ্বর দাস নাগর নামক আরেক অবসরপ্রাপ্ত অভিজাত আলমগীরকে তাঁর দীর্ঘ শাসনামলে বিরাজরত শান্তি, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্যসমূহের জন্য কৃতিত্ব দেন। নাগরের এই বিবরণ ইতিহাসের এক ধারাবাহিকতাকেই অনুসরণ করেছিল, যেখানে সম্রাটকে একজন নিবেদিতপ্রাণ, এমনকি বীরত্বপূর্ণ প্রশাসক ও তাঁর অর্ধ-শতাব্দীর শাসনকে সরকারী দক্ষতার এক ‘স্বর্ণযুগ’ হিসেবে প্রশংসা করা হয়।
সম্রাটকে প্রশাসন, সামরিক কার্যকলাপ বা ধর্মীয় ভক্তিতে নিযুক্তরূপে চিত্রায়ণ করা শত শত ছবির আবির্ভাবের ফলে আলমগীরের প্রতি ভক্তি আরেক দফা বৃদ্ধি পেয়েছিল। শুধুমাত্র মুঘল দরবারেই নয়, ১৭০৭-পরবর্তী সময়ে অঙ্কিত এসব চিত্রের অনেকগুলোই উৎপাদিত হয়েছিল উত্তর ভারতের হিন্দু দরবারসমূহে, যার ভেতর অনেকেই ছিলেন মুঘলদের প্রাক্তন শত্রু। এর ফলে সেই সময়ে ‘আলমগীর ভক্তি’-র বিস্তারের দিকটি প্রতিফলিত হয়। অন্য কোন মুঘল সম্রাট আলমগীরের মত এত দীর্ঘ সময় ধরে এতটা সম্মানীয় ছিলেন না।
তবে, সময়ের সাথে সাথে ও ধীরে ধীরে ভারতীয়রা মুঘল আমল, বিশেষ করে আলমগীরের শাসনামলকে ক্রমবর্ধমান নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে শুরু করে। অষ্টাদশ শতকের শেষ দিকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দক্ষিণ এশিয়ার নিয়ন্ত্রণ অর্জন করার পর, ব্রিটিশ প্রশাসকরা বিদেশি হিসেবে তাদের শাসনকে ন্যায্যতা প্রদানের কোন স্বদেশী যুক্তি প্রয়োগ করতে না পেরে, তাদের মাধ্যমে ভারতীয় উপনিবেশে আমদানিকৃত দক্ষতা, ন্যায়বিচার, শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে উদ্ধৃত করতো। আর কোম্পানির আগমণের অব্যবহিত পূর্বে যেহেতু মুঘলদের শাসন ছিল, তাই একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত ও অস্থিতিশীল অঞ্চলে মুঘল শাসকদেরকে অপরিহার্যভাবে অদক্ষ ও অন্যায্য স্বৈরশাসক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হতো।
মুসলমান ও হিন্দুদেরকে সমজাতীয় ও পরস্পরবিরোধী সম্প্রদায় হিসেবে চিহ্নিত করতে পারার ফলে ইংরেজদের পক্ষে “ভাগ করো ও শাসন করো”-র মতো প্রাচীন রোমান কৌশলে ঔপনিবেশিক নীতি প্রণয়ন করাও সহজ হয়েছিল। মুঘলদেরকে বিদেশি ‘মোহামেডান’, যারা প্রধানত অ-মুসলিম জনগণকে নিপীড়ন করেছিল, এমন এক ভিনদেশি হিসেবে দেখার ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গির ফলে দেশীয় হিন্দু ‘নিজ’ ও ভিনদেশি মুসলিম ‘অপর’-এর ধারণাটি শক্তিপ্রাপ্ত হয়, যা অনেক বেশি ক্ষতিকর ছিল এবং ভবিষ্যতে তিক্ত ফল বয়ে আনে।
ঔপনিবেশিক শাসনের ভেতর উদ্ভূত হলেও, উনবিংশ শতাব্দীর এগিয়ে চলার সাথে সাথে এবং ভারতীয়রা ক্রমবর্ধমানভাবে ব্রিটিশ রাজের শিক্ষা ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানসমূহে যুক্ত হওয়ায়, এই ধারণাগুলো ধীরে ধীরে জনপরিসরে ছড়িয়ে পড়ে। তবে, ১৮৮০-র দশকে ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আবেগের প্রথম সঞ্চারণের আগে এ ধরনের ঔপনিবেশিক বক্রোক্তিসমূহের ব্যাপকতর রাজনীতিকরণ ঘটে নি। একটি স্বাধীন জাতি গঠনের সম্ভাবনা শেকড় গাড়ার কালে ভারতীয় জাতীয়তাবাদীরা তাদের নিজ অতীতে এমন সব চিহ্ন খুঁজতে থাকে, যা তাদের লক্ষ্যের প্রতি জনগণের সমর্থনকে অনুপ্রাণিত ও সংগঠিত করতে পারবে। এর ফলে ইতিহাস রচনা শীঘ্রই রাজনৈতিক প্রয়াসে পরিণত হয়, যা শেষ পর্যন্ত নায়ক ও খলনায়কদের স্পষ্টভাবে পৃথক করা এক ভালো-খারাপভিত্তিক নৈতিকতার ময়দানে পরিণত হয়। সংক্ষেপে, ভারতের প্রাক-ঔপনিবেশিক অতীত এমন একটি মঞ্চে পরিণত হয়েছিল, যেখানে সবাই না হলেও অনেক হিন্দু জাতীয়তাবাদী হিন্দু নিজ ও মুসলিম অপরের ধারণার মঞ্চায়ন করেছিলেন।
১৯১২ থেকে ১৯২৪ সালে ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইতিহাসবিদ যদুনাথ সরকার তার পাঁচ খণ্ডের গ্রন্থ “History of Aurangzib” প্রকাশ করেন। এটি সম্রাট আলমগীরের রাজকীয় নাম, যিনি শীঘ্রই মুঘল রাজবংশের সবচেয়ে বিতর্কিত ও শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে ঘৃণিত শাসকে পরিণত হন। যদুনাথ সরকারের গবেষণা এতটাই বিস্তারিত, পুঙ্খানুপুঙ্খ ও পাণ্ডিত্যপূর্ণ ছিল যে, এই প্রকাশনার শতবছর পার হলেও নতুন কোন ঐতিহাসিক আলমগীরের শাসনামলের ওপর আরেকটি পূর্ণাঙ্গ গবেষণার চেষ্টা করেন নি।
এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ১ম বিশ্বযুদ্ধ ও তীব্রতর হতে থাকা এক জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে থেকে যদুনাথ সরকার তাঁর গ্রন্থগুলো রচনা করেছিলেন। ১৯০৫ সালে ভারতের ভাইসরয় লর্ড কার্জন যদুনাথ সরকারের নিজ প্রদেশ বাংলাকে ভাগ করেছিলেন। এই নিষ্ঠুর ভাগ করে শাসন করার কর্মসূচিতে বাঙালি মুসলমানদেরকে মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ব বাংলা নামক নতুন প্রদেশ ‘উপহার’ দেয়া হয়। ঠিক তার পরের বছরই ভারতের মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ নামক রাজনৈতিক দলের আবির্ভাব ঘটে।
এদিকে, বঙ্গভঙ্গের ফলে বাঙালি হিন্দুদের ভেতর প্রচণ্ড প্রতিবাদের উদগীড়ন ঘটে, যা ভারতজুড়ে ব্রিটিশ পণ্য বয়কটের মতো কর্মসূচির দিকে ধাবিত হয়। শেষ পর্যন্ত, সরকার হিন্দুদের দাবির কাছে নতিস্বীকার করে এবং ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করা হয়। এর ফলে ভারতের সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের ভেতর ভয় ও উদ্বেগ আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
ঠিক এরকম এক উত্তপ্ত রাজনৈতিক বাস্তবতায় যদুনাথ সরকার আলমগীরের জীবনী রচনার কাজটি করেছিলেন। তার গ্রন্থের প্রতিটি নতুন খণ্ডে সম্রাটকে আরো বেশি নেতিবাচকভাবে চিত্রিত করা হচ্ছিলো। সার্বিকভাবে মুসলমানদের চিত্রায়নের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটছিল। শেষ পর্যন্ত, যদুনাথ সরকার হিন্দু বিদ্যালয় ও মন্দির ধ্বংসের জন্য আলমগীরকে দায়ী করেন, যার ফলে হিন্দুরা “জ্ঞানের আলো” ও “ধর্মের আশ্রয়” থেকে বঞ্চিত হয় এবং হিন্দুদেরকে “নিরন্তর প্রকাশ্য অপমান ও রাজনৈতিক অক্ষমতার” সম্মুখীন হতে হয়।
একটি স্বাধীন রাষ্ট্র আদায়ের লক্ষ্যে ক্রমবর্ধমান আন্দোলনের কালে নিজ লেখায় যদুনাথ সরকার “হিন্দু ও মুসলমানের ভেতর কোন ধরনের সংমিশ্রণ অসম্ভব”, এমন ভাব বজায় রেখেছিলেন। তিনি এটিও বলেছিলেন যে একজন মুসলমান ভারতে আছে তা অনুভব করতে পারলেও ভারতকে অনুভব করতে পারে না, এবং আলমগীর “ইচ্ছাকৃতভাবে আকবর কর্তৃক সূচিত জাতীয় ও যৌক্তিক নীতিসমূহ বাতিল করেছিলেন”।
সম্ভবত অন্যান্য কারণের চেয়ে আলমগীর সম্পর্কে যদুনাথ সরকারের নেতিবাচক মূল্যায়নই ভারতের ইতিহাসে তাঁর অবস্থান সম্পর্কে লক্ষ লক্ষ মানুষের ভাবনাকে গঠন করে দিয়েছিল। “History of Aurangzib” প্রকাশের পর থেকে পেশাদার ঐতিহাসিকরা সম্রাট আলমগীর সম্পর্কে লেখা থেকে মূলত বিরত থেকেছেন, যেন তিনি রাজনৈতিকভাবে একজন তেজস্ক্রিয় ব্যক্তি। এর ফলে ভারতের জনতুষ্টিবাদী নেতাদের সামনে জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে এই মুঘল সম্রাটকে দানবরূপে চিত্রায়নের পথটি উন্মুক্ত হয়।
আজ লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে আলমগীর হলো প্রাক-আধুনিক ইন্দো-মুসলিম দুর্বৃত্ত শাসকদের তালিকায় থাকা প্রধান খলনায়ক, একজন গোঁড়া ধর্মান্ধ যিনি আকবর কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করেছিলেন এবং ভারতকে এমন এক হঠকারী পথে ঠেলে দিয়েছিলেন, অনেকের মতে ১৯৪৭ সালে একটি পৃথক মুসলিম রাষ্ট্র তথা পাকিস্তান সৃষ্টির মাধ্যমে যার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে।
আজকের বৃহৎ ও সব কিছু করা যায় এমন ব্লগ জগতে, সামাজিক মাধ্যমের পোস্টে ও সিনেমা হলে, আলমগীরকে এক ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র, উদ্ভট ব্যঙ্গচিত্রে পরিণত করা হয়েছে, যা এক ঐতিহাসিক আঘাত প্রদানের বস্তু হিসেবে কাজ করছে। এর একটি সাম্প্রতিক উদাহরণ হলো (২০২৫ সালের) ১৪ ফেব্রুয়ারি মুক্তিপ্রাপ্ত ছাভা নামক বলিউড ব্লকবাস্টার চলচ্চিত্র, যা অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এক মহাতারকার মর্যাদা অর্জন করে। মার্চ মাসের শেষ দিকে মুক্তির ষষ্ঠ সপ্তাহর হিসেবে চলচ্চিত্রটি ভারতের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আয় করেছিল।
একই নামের একটি মারাঠি উপন্যাসের ভিত্তিতে নির্মিত ছাভা চলচ্চিত্র আলমগীরের দাক্ষিণাত্য অঞ্চলের অপরাজিত রাজ্যসমূহ জয়ের লক্ষ্যে পরিচালিত ২৫ বছরব্যাপী অভিযানের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের কথা বলতে চায়। এতে ছিল বিজাপুর ও গোলকোন্ডা নামক দুইটি প্রাচীন সালতানাত এবং সদ্য গঠিত এক মারাঠা রাজ্য। ১৬৭৪ সালে এই মারাঠা রাজ্যটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মুঘলদের প্রধান শত্রু দুর্ধর্ষ সর্দার শিবাজী (শাসনকাল ১৬৭৪-৮০)। শিবাজীর জ্যেষ্ঠ পুত্র ও উত্তরসূরি সম্ভাজীর (শাসনকাল ১৬৮০-৮৯) রাজত্ব, মুঘল বাহিনীর বিরুদ্ধে তার সংগ্রাম এবং ১৬৮৯ সালে আলমগীরের নির্দেশে তার ওপর নেমে আসা বন্দিদশা, নির্যাতন ও মৃত্যুদণ্ড এই চলচ্চিত্রের মূল উপজীব্য।
চলচ্চিত্রটি সূক্ষ্ম নয়। এতে দৃশ্যায়িত অবিরাম সহিংসতা, অকারণ রক্তপাত, অতিনাটকীয় বর্ণনা ও ভালো-খারাপের দ্বিমেরুভিত্তিক বিশ্বদৃষ্টির মাধ্যমে চলচ্চিত্রটি সম্ভাজী ও আলমগীরের দ্বন্দ্বকে এক কার্টুনসদৃশ প্রদর্শনে পরিণত করে, ঠিক যেমন মার্ভেল কমিক্সে স্পাইডার ম্যান ও ডক্টর ডুমের ভেতর লড়াই চলে। চলচ্চিত্রটিতে সম্ভাজী যেখানে এককভাবে সম্পূর্ণ মুঘল বাহিনীকে পরাস্ত করেন, সেখানে আলমগীরকে এক খাঁটি ভীতিকর শয়তান হিসেবে দেখানো হয়। এতে বেসামরিক নাগরিকদের প্রতি মুঘল বাহিনী পরিচালিত চরম নিষ্ঠুরতাও দেখা যায়, যেখানে তারা নিরপরাধ ভারতীয়দের গাছে ঝুলিয়ে ফাঁসি দেয়, নারীদের যৌন নিপীড়ন করে, একজন রাখাল বালিকাকে পুড়িয়ে মারে, ইত্যাদি ইত্যাদি।
বাস্তবে, আলমগীর ভারতীয় গ্রাম লুণ্ঠন বা বেসামরিক নাগরিকদের উপর আক্রমণ করার জন্য পরিচিত নন (মারাঠাদের মতো তো একেবারেই নন, ১৭৪০-এর দশকে শুধুমাত্র বাংলা অঞ্চলে মারাঠাদের আক্রমণে প্রায় চার লাখ বেসামরিক মানুষের মৃত্যু হয়েছিল)। অন্যদিকে, সমসাময়িক সূত্রসমূহ সম্ভাজীর প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার দিকে নির্দেশ করে। পিতার উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত রাজত্ব থেকে মুখ্য মারাঠা সেনা কর্তৃক সম্ভাজীকে অস্বীকার; মদ ও আমোদ-প্রমোদের প্রতি তার দুর্বলতা; এবং কীভাবে তাকে বন্দি করার জন্য প্রেরিত মুঘল বাহিনীকে প্রতিরোধের পরিবর্তে তিনি তার মন্ত্রীর বাড়ির একটি গর্তে লুকিয়েছিলেন, সেখান থেকে তাকে তার লম্বা চুল ধরে টেনে বের করে কীভাবে আলমগীরের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়, তার সবই এসব সূত্রে নথিভুক্ত আছে।
ছাভা-র শক্তির জায়গা তার ঐতিহাসিক নির্ভুলতা বা উদ্দেশ্য নয়। বরং চলচ্চিত্রটির ফলাফলই সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। মুক্তির কয়েক সপ্তাহের ভেতর চলচ্চিত্রটি আলমগীর ও মুঘলদের বিরুদ্ধে জনরোষ উসকে দিতে সফল হয়। একটি প্রেক্ষাগৃহে একজন দর্শক মধ্যযুগীয় যোদ্ধার পোশাকে ঘোড়ায় চড়ে থিয়েটারে প্রবেশ করেন। অন্য এক প্রেক্ষাগৃহে সম্ভাজীর নির্যাতনের দীর্ঘ দৃশ্যের সময় একজন দর্শক এতটাই উত্তেজিত হয়ে পড়েন যে তিনি লাফিয়ে মঞ্চে উঠে যান এবং পর্দা ছিঁড়ে ফেলতে শুরু করেন।
রাজনীতিবিদরাও দ্রুতই এই হাঙ্গামায় নিজেদের যুক্ত করেন। মার্চের প্রথম দিকে ভারতের শাসক দল বিজেপি-র একজন সদস্য মারাঠা রাজ্যের কেন্দ্রস্থল মহারাষ্ট্র থেকে আলমগীরের কবর সরিয়ে নেয়ার দাবি তোলেন। ১৬ই মার্চ দলের আরেক সদস্য এক ধাপ এগিয়ে সম্রাটের সমাধি ধ্বংসের দাবি উত্থাপন করেন। ঠিক তার পরের দিন ভারতের উগ্র-ডানপন্থী, আধাসামরিক হিন্দু শ্রেষ্ঠত্ববাদী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের সদর দপ্তর নাগপুরে দাঙ্গা শুরু হয়। আলমগীরের কবর ধ্বংসের সমর্থনকারী সংঘের প্রায় ১০০ কর্মী কর্তৃক সম্রাটের একটি কুশপুত্তলিকা পোড়ানোর মাধ্যমে এই দাঙ্গার সূচনা ঘটে।
এর প্রতিক্রিয়ায় শহরের মুসলমানদের একটি দল পাল্টা প্রতিবাদ করে। এসবের ফলাফল ছিল ব্যাপক সহিংসতা, ব্যক্তিগত আঘাতপ্রাপ্তি, সম্পদের ক্ষতিসাধন ও অসংখ্য গ্রেপ্তার। আলমগীরের শেষ বিশ্রামস্থল ধ্বংসের এই উত্তেজক দাবিটি আদতে অত্যন্ত বিদ্রূপাত্মক। কারণ, ১৭০৭ সালে সম্ভাজীর পুত্র ও মারাঠা সিংহাসনের শেষ উত্তরসূরি শাহু আলমগীরের সমাধিতে ভক্তিপূর্ণ শ্রদ্ধা জানানোর উদ্দেশ্যে নিজ পায়ে হেঁটে ৭৫ মাইল পথ পাড়ি দিয়েছিলেন।
আলমগীরের সমাধিস্থল নিয়ে প্রকাশিত ক্ষোভ দিনশেষে বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের সাথে ঐতিহাসিক অতীতের সামঞ্জস্য বিধানের লালসাকেই সামনে নিয়ে আসে। ২০২৫ সালের মার্চ মাসের শেষ দিকে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্য ও সাংসদদের জন্য শাসক দল কর্তৃক নয়াদিল্লির সংসদ ভবনে চলচ্চিত্রটির একটি বিশেষ প্রদর্শনী আয়োজনের মাধ্যমে ছাভা চলচ্চিত্রে বর্ণিত ইতিহাসের সংস্করণটির প্রতি ভারত সরকারের সমর্থন বুঝতে পারা যায়।
বর্তমান সময়ের কল্পনার সাথে সামঞ্জস্য বিধানের জন্য শুধুমাত্র যে ঐতিহাসিক অতীতেই হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে তা নয়, বরং ভূখণ্ডকেও এক্ষেত্রে বাদ দেয়া হচ্ছে না। ২০১৫ সালে ভারত সরকার নয়াদিল্লির আওরঙ্গজেব সড়কের নাম একজন প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির নামে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিবর্তন করে। অথচ ব্রিটিশরা যখন শহরটি প্রতিষ্ঠা করেছিল, তখন থেকে সড়কটি আওরঙ্গজেবের নামে ছিল। এর আট বছর পর (২০২৩ সালে), ১৬৫৩ সালে দাক্ষিণাত্যের গভর্নর থাকাকালীন যুবরাজ আওরঙ্গজেব কর্তৃক নিজের নামে নামকরণকৃত ঔরাঙ্গাবাদ শহরের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় সম্ভাজী নগর। ১৬৮৯ সালে আওরঙ্গজেব কর্তৃক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সম্ভাজীর প্রতি সম্মান প্রদর্শনপূর্বক এই পরিবর্তনটি করা হয়।
এ ধরনের পদক্ষেপসমূহ ভারতীয় মানচিত্র থেকে মুঘল বা ইসলামের সাথে সম্পর্কিত নামগুলোকে হিন্দু সম্পর্কিত নাম দ্বারা প্রতিস্থাপন করা, অথবা সরলভাবে বললে বিভিন্ন স্থানে শব্দগতভাবে আরবি-ফারসি উপাদান ধারণকারী নামগুলোকে সংস্কৃতায়িত করার যে বৃহত্তর লক্ষ্য সরকারের রয়েছে, তার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। এ ধরনের উদাহরণের ভেতর আরো রয়েছে মুস্তাফাবাদ থেকে সরস্বতী নগর (২০১৬), এলাহাবাদ থেকে প্রয়োগরাজ (২০১৮), হোশাঙ্গাবাদ থেকে নর্মদাপুরম (২০২১), আহমেদনগর থেকে অহিল্যানগর (২০২৩), এবং করিমগঞ্জ থেকে শ্রীভূমি (২০২৪)। শুধুমাত্র উত্তর প্রদেশেই এমন ১৪টি পরিবর্তনের প্রস্তাবসহ সারা দেশে এরূপ অসংখ্য পরিবর্তনের প্রস্তাব আনা হয়েছে, যদিও সেগুলো এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত হয়নি।
বলা হয়ে থাকে অতীত হলো এক বিদেশি রাষ্ট্র। এ কথা সত্যি যে কেউ কখনো তার পূর্ববর্তী প্রজন্মের মানসিকতায় সম্পূর্ণরূপে প্রবেশ করতে পারে না। কিন্তু সমসাময়িক সাক্ষ্য-প্রমাণ ও যৌক্তিক যুক্তি দ্বারা সতর্কতার সাথে যদি ইতিহাসকে পুনর্গঠিত করা না হয় এবং জনগণের সামনে যদি তা দায়িত্বশীলভাবে উপস্থাপন করা না হয়, তাহলে আমাদেরকে “কল্পিত অতীতের প্রতি এক রহস্যময় দৃষ্টিভঙ্গি” ও তা থেকে উদ্ভূত সকল হুমকিসমেত চিরকাল বেঁচে থাকার ঝুঁকি নিতে হয়, ঠিক যে ব্যাপারে রেমনিক সতর্ক করেছেন।



