শিবলী নোমান

বিউপনিবেশায়নের মানবিক দুনিয়া

শিবলী নোমান

১৯৫২ সালে প্রকাশিত হয় ফরাসি ভাষায় রচিত ফ্রানজ ফাঁনোর সাইকোঅ্যানালিসিস, ইংরেজি সংস্করণে যে বইটির নামকরণ করা হয়েছিল ব্ল্যাক স্কিন, হোয়াইট মাস্কস। সে সময় ফাঁনো ছিলেন মাত্র ২৭ বছর বয়সী একজন মনোচিকিৎসক। যদিও ফরাসি উপনিবেশে বেড়ে ওঠা, ফ্রান্সে পড়ালেখা ও ফ্রান্সের হয়ে সেনাবাহিনীতে কাজ করার সাথে সাথে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধপূর্ব বিশ্বরাজনীতির গতিপ্রবাহ, আফ্রিকার ফরাসি উপনিবেশগুলোতে গড়ে ওঠা নেগ্রোচ্যুড আন্দোলন ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধপরবর্তী পরিবর্তিত বৈশ্বিক পরিস্থিতির অভিজ্ঞতাগুলো নিঃসন্দেহে ফাঁনোকে পরিণত করেছিল একজন প্রকৃত চিন্তাশীল মানুষ হিসেবে। আফ্রিকার একজন মানুষ হিসেবে, উপনিবেশিত একজন মানুষ হিসেবে, সর্বোপরি একজন নিগ্রো মানুষ হিসেবে নিজের সাথে ফাঁনোর বোঝাপড়ার পাশাপাশি এই বইতেই ফাঁনো দেখানোর চেষ্টা করেছেন আফ্রিকার কালো মানুষ তথা নিগ্রোদের মনস্তত্ত্ব, দেখাতে চেয়েছেন আফ্রিকার নিগ্রোদের নিয়ে সাদা চামড়ার মানুষ তথা পশ্চিমাদের মনস্তত্ত্ব।

ফাঁনোর বইয়ের ২০০৮ সালের সংস্করণের ভূমিকায় জিয়াউদ্দিন সরদার একটি দারুণ দিকে পাঠকদের চিন্তা আকর্ষণ করেছেন। সরদার বলছেন, ফাঁনো তার রচনায় যাদের সাদা চামড়ার মানুষ বলেছেন, তারা যেমন পশ্চিমা দুনিয়ার লোক; ঠিক তেমনি ফাঁনোর লেখনিতে আসা ‘ব্ল্যাক পিপল’ মানে আসলে সারা পৃথিবীর অপশ্চিমা মানুষ। সেই হিসাবে ফাঁনো শুধু আফ্রিকান বা নিগ্রোদের নিয়ে আলোচনা করেননি, বরং পশ্চিম তথা ইউরোপের বাইরের সকল মানুষকে নিয়েই ফাঁনো ভাবতে চেয়েছেন। যদিও সঙ্গত কারণেই তার কাজের ক্ষেত্রের একটি বড় অংশ জুড়ে আফ্রিকান তথা নিগ্রোরা থেকে যাওয়ায়, তার রচনা ও আলোচনায় ঘুরে-ফিরে নিগ্রো সম্পর্কিত আলোচনাই সব সময় থেকেছে প্রাথমিক বিষয় হিসেবে।

অ্যানতিলিস বা ক্যারিবিয় অঞ্চলে বেড়ে ওঠা ফাঁনো খুব স্পষ্টভাবেই যে কথা বলছেন তা হলো যে তিনি একজন কালো মানুষ, তথা একজন নিগ্রো হিসেবে সবার আগে নিজেকে স্বীকার করে নিচ্ছেন। আবার একইসাথে তিনি নিজেকে একজন ফরাসি নাগরিক হিসেবেও চিহ্নিত করছেন। দাবি জানাচ্ছেন তাকে ফরাসি হিসেবে মেনে নেওয়ার। অর্থাৎ একইসাথে তিনি আপাত দৃষ্টিতে সাংঘর্ষিক দুইটি পরিচয় ধারণ করার কথা বলছেন খুব স্পষ্ট ও সাবলীলভাবে। তিনি মূলত বলতে চাচ্ছেন যে ফরাসি উপনিবেশগুলোর মানুষ যখন উপনিবেশের উত্তরাধিকার হয়ে বিভিন্ন কারণে ফ্রান্সে যাচ্ছে কিংবা ফ্রান্সে থেকে যাচ্ছে, তখন আসলে সে একজন ফরাসি নাগরিক হিসেবেই সেখানে থাকছে; আর তাই তাকে একজন ফরাসি হিসেবে মেনে নেওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু আদতে তা হয়ে ওঠে না, তা হয়ে উঠতে দেওয়া হয় না।

মানুষ হিসেবে আর সব কিছুর প্রতি মিল থাকলেও আফ্রিকার নিগ্রো আর ফ্রান্সের সাদা চামড়ার মানুষের ভেতর যে বাহ্যিক তফাৎ, অর্থাৎ শরীরের চামড়ার রঙে যে পার্থক্য তার প্রভাব যে কতটা গভীর, একের পর এক উদাহরণ ফাঁনো তার কর্মজীবনে দেখেছেন, করেছেন লিপিবদ্ধ। এডওয়ার্ড সাঈদ যেমন তার অরিয়েন্টালিজমে দেখাচ্ছেন কীভাবে এই ইঙ্গ-ফরাসি সাহিত্যে সেমেটিক মানুষদের কাল্পনিক চিত্রায়ন করা হয়েছে, বছরের পর বছর আজগুবিভাবে নির্মাণ করা হয়েছে প্রাচ্যকে এবং এসব কল্পনার পরিপ্রেক্ষিতেই আবার বিচার করা হয়েছে প্রাচ্যকে। ঠিক সেভাবেই ফাঁনো দেখিয়ে দিচ্ছেন আফ্রিকার একজন নিগ্রো নারী বা পুরুষ সম্পর্কে সাদা চামড়ার ফরাসি তথা পশ্চিমারা কীভাবে এক ধরনের ‘কালেক্টিভ আনকনশাস’ বা সামষ্টিক অচেতনতার ভেতর জীবন পার করে দেয়।

ফাঁনো বলছেন একজন ইহুদি যেমন একজন ইউরোপীয়র কাছে ভয়ঙ্কর এবং অস্বাভাবিক কিছু, ঠিক সেভাবেই একজন নিগ্রো অপর কিংবা প্রতিটি ইউরোপীয় নাগরিকের কাছে আশ্চর্য ও ভয়ের কিছু। ইউরোপীয়রা ইহুদিদের ভয় পায় তাদের সর্বব্যাপীতার জন্যে, তাদের উন্নয়নকে তারা অভিশপ্ত কিছু একটার সাথে কল্পনা করে, হিংসা করে ইহুদিদের সামগ্রিক বুদ্ধিবৃত্তিক তৎপরতা। অন্যদিকে, আফ্রিকার নিগ্রো মানুষরাও পশ্চিমাদের কাছে এক ধরনের আতঙ্কের প্রতীক। কী সেই আতঙ্ক? ফাঁনো সাইকোঅ্যানালিসিসের মাধ্যমে দেখাচ্ছেন, আফ্রিকার নিগ্রোদেরকে পশ্চিমারা চিহ্নিত করে অদ্ভুত যৌনশক্তির সাথে, অস্বাভাবিক যৌনাচারের সাথে, অতিকায় শিশ্নের সাথে। আর চূড়ান্ত বিচারে এসব কল্পনার মাধ্যমে ইউরোপীয়রা যৌন বিষয়াদিতে নিজেদেরকে নিগ্রোদের বিপরীতে তুলনামূলক অক্ষমরূপে বিবেচনা করে। আর এসব কারণেই একজন নিগ্রোকে দেখলে যেমন সাদা চামড়ার মানুষের আচরণ বদলে যায়, ঠিক তেমনি একজন সাদা চামড়ার মানুষের সামনে পড়লেই একজন নিগ্রোর ভেতর দেখা দেয় নানা ধরনের অস্বাভাবিকত্ব।

তাছাড়া মানুষের ওপর মানুষের চিন্তার আধিপত্যের ক্ষেত্রে ফাঁনো ভাষার প্রভাবের দিকেও আলোকপাত করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন আফ্রিকার ফরাসি উপনিবেশগুলোতে ফরাসি ভাষাকে প্রথম ভাষা হিসেবে চাপিয়ে দিয়ে ও স্থানীয় ভাষা কিংবা স্থানীয় ভাষার সাথে ঔপনিবেশিক ভাষাগুলোর মিলনের ফলে তৈরি ভাষাগুলোকে হেয় প্রতিপন্ন করে প্রতিনিয়ত কীভাবে উপনিবেশকে ও ঔপনিবেশিক চিন্তাকে টিকিয়ে রাখা হয়। জিয়াউদ্দিন সরদার এক্ষেত্রে অভিধানে ‘সাদা’ শব্দের সাথে সম্পর্কিত ১৩৪ ধরনের ইতিবাচক বিষয় ও ‘কালো’ শব্দের সাথে সম্পর্কিত অন্তত ১২০ ধরনের নেতিবাচক বিষয়ের দিকে আলোকপাত করেছেন। সাদা-কালো বা এর উপস্থাপন নিয়ে দৈনন্দিন জীবনে এই রাজনীতির শিকার কি আমরাও নই? ভেবে দেখার আমন্ত্রণ থাকলো!

নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গো বা সমমনা চিন্তকদের মতো ফাঁনোও কিন্তু আফ্রিকান মানুষের বিউপনিবেশায়নের ক্ষেত্রে জাতীয় সংস্কৃতির উত্থানের প্রয়োজনীয়তাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন। এজন্যেই নেগ্রিচ্যুড আন্দোলনে তিনি এক ধরনের সম্ভাবনা দেখেছিলেন, হয়েছিলেন এর দ্বারা প্রভাবিতও। থিয়োঙ্গোর মতো ফাঁনোও মনে করেন স্থানীয় বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের পাশাপাশি কৃষক-শ্রমিক তথা গণমানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণে জাতীয় তথা নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক তৎপরতাগুলোকে ফিরিয়ে আনার মাধ্যমেই উপনিবেশের উত্তরাধিকারকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। তবে এই জাতীয়তাবাদী অবস্থান উগ্রতায় পরিণত হলে যে সমূহ বিপদের আশঙ্কা থেকে যায়, সেই বিপদ থেকে আশু মুক্তির ইশতেহারও ফাঁনোর চিন্তায় খুঁজে পাওয়া যায়।

দিনশেষে ফাঁনো অন্য সব সাধারণ নিগ্রোর মতো সাদা চামড়ার মানুষের নিজেদের বড় করে দেখার বা ভাবার বাস্তবতা ধ্বংস করে দিতে চান না। কিংবা তিনি চান না যে একজন কৃষ্ণাঙ্গ আরেকজন শ্বেতাঙ্গের স্তরে উঠে আসুক ও সেই নতুন উচ্চ অবস্থানে টিকে থাকুক দীর্ঘকাল। ফাঁনোর অনন্যতা ও প্রাসঙ্গিকতা সম্ভবত এখানেই। ফাঁনো এই দুইটির কোনোটিই চান না। ফাঁনো আসলে এই ধরনের চিন্তাজগতে এক ধরনের পুনর্গঠন বা পুনর্কাঠামোবদ্ধকরণের ইচ্ছা পোষণ করেন। তিনি মনে করেন ইউরোপবাসী পাঁচ শতাব্দী আগে ব্যবসার উদ্দেশে যে সমুদ্রযাত্রা শুরু করেছিল, যার পরিণতি ছিল বিশ্বব্যাপী উপনিবেশ স্থাপন কিংবা আরও বৃহৎ পরিসরে আজকের সাদা-কালো বর্ণবাদ, সেই শত শত বছর আগে পশ্চিমা সাদা চামড়ার মানুষের কৃতকর্মের দায় আজকের একজন পশ্চিমা শ্বেতাঙ্গ মানুষের ওপর চাপানোর কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। একই সাথে একজন কৃষ্ণাঙ্গকে এই জন্যে আজ দায়ী করা যাবে না যে কেন তার পূর্বপুরুষরা তাদের সমাজ-কাঠামোর বিরুদ্ধে গিয়ে সাদাদের চাপিয়ে দেওয়া দাসত্বকে মেনে নিয়েছিল।

ফাঁনো দিন শেষে এমন এক পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে থাকেন যেখানে এক মানুষের ওপর আরেক মানুষের কোনো প্রভাবের জায়গা নেই। মানুষে মানুষে নেই কোনো ছোট-বড়র হিসাব। বরং তিনি চান একের কাছে অপরের স্বীকৃতি, তিনি চান একজনের কাছে অপরজনের প্রতি পারস্পরিক সচেতনতা। মানুষে-মানুষে যেই সচেতনতা থেকে পারস্পরিক নৈকট্যবোধের মাধ্যমে পৃথিবীকে মনে হতে পারে অনেক বেশি মানবিক, নমনীয় ও বাসযোগ্য।

(রচনাকাল: নভেম্বর, ২০২০)

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।